ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ? জানলে অবাক হবেন

মধুপুরের লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা কিছু এলাকা সুবিধাজনক হলেও ভবনের নির্মাণমানই নির্ধারণ করে প্রকৃত ঝুঁকি; উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’
ঢাকায় ভূমিকম্প হলে কোন এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ- এমন প্রশ্ন প্রায়ই উঠে আসে নগরবাসীর মনে। তবে এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো এলাকার নিরাপত্তা শুধু মাটির গঠন নয়, বরং ভবনের কাঠামোগত মান, জনঘনত্ব এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- একটি হলো এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন, অন্যটি অবকাঠামোর মান। ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, ঢাকা ও এর আশপাশের অধিকাংশ এলাকার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রায় একই ধরনের। শহরের উত্তরাংশে মধুপুরের শক্ত লাল মাটির বিস্তার থাকায় এসব এলাকা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী পূর্ব ও পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব অঞ্চলের অনেক জায়গায় আগে জলাশয় ও নরম পলিমাটি ছিল, যা পরে ভরাট করে বসতি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের সময় এসব এলাকার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল মাটির গঠন দেখে কোনো এলাকাকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাবে না।
এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, কোনো এলাকার ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সেটিকে ঝুঁকিমুক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তার মতে, পুরান ঢাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ থাকলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সেখানকার সরু রাস্তা, যা দুর্যোগের সময় উদ্ধার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুরান ঢাকার অনেক ভবন শত বছরের বেশি সময় ধরে টিকে আছে এবং অতীতের বিভিন্ন ভূমিকম্পেও অক্ষত রয়েছে। ফলে ভবনের কাঠামোগত শক্তিই ঝুঁকি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকার জন্য নতুন উদ্বেগ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে কোনো সক্রিয় ফল্ট লাইন নেই। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যুতি রেখা বা ফল্ট জোন রয়েছে, যেগুলো অতীতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎস ছিল। এর মধ্যে মিয়ানমার-নোয়াখালী প্লেট বাউন্ডারি, নরসিংদী অঞ্চল, সিলেটমুখী ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং মধুপুর ফল্ট উল্লেখযোগ্য। গবেষকদের ধারণা, এসব অঞ্চলের কিছু অংশে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’। এ ধরনের ফল্ট ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে সহজে শনাক্ত করা যায় না। ফলে আগে থেকে সতর্ক হওয়ার সুযোগও সীমিত। বর্তমানে বাংলাদেশে ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলে দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অদৃশ্য ফল্টের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হওয়ায় রাজধানী ঢাকার জন্যও এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, ভূমিকম্পে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানসম্মত ভবন নির্মাণ, বিল্ডিং কোড মেনে চলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করা। শুধু এলাকার নাম নয়, ভবনের নির্মাণমানই শেষ পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তা নির্ধারণ করে।



