বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
নারী

বাংলাদেশের এক শিশুর গান শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন শাকিরা

WhatsApp Image 2026-06-25 at 9.14.22 PM

বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসেন ল্যাটিন পপ সেনসেশন শাকিরা। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কিংবা ‘লা লা লা’ গানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এই তারকার সঙ্গে বাংলাদেশেরও জড়িয়ে আছে এক আবেগঘন স্মৃতি। অনেকের অজানা, প্রায় ১৯ বছর আগে ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিধ্বস্ত বাংলাদেশে এসে দুর্গত মানুষের জীবনযন্ত্রণা দেখে আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

২০০৭ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। হাজারো মানুষ প্রাণ হারায়, অসংখ্য পরিবার হয়ে পড়ে নিঃস্ব। সেই দুর্যোগের পর ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। ঢাকায় পৌঁছানোর পর আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে তিনি সরাসরি চলে যান সিডর-আক্রান্ত উপকূলীয় অঞ্চলে। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পটুয়াখালী পরিদর্শন। সেখানে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন, শিশুদের খোঁজখবর নেন এবং দুর্যোগের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখেন।

এই সফরের সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল নিপা নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। ঘূর্ণিঝড়ে মা-বাবাকে হারানো মেয়েটি শাকিরার সামনে একটি করুণ গান গেয়েছিল। পরে শাকিরা স্মৃতিচারণ করে জানান, গানটির অর্থ ছিল- “মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।” শিশুটির কণ্ঠে সেই আকুতি শুনে তিনি গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘদিন পরও সেই স্মৃতি ভুলতে পারেননি। দুর্গত এলাকার বাস্তবতা দেখে শাকিরা বলেছিলেন, পুরো গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। মানুষের জীবনের সব অর্জন মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা, স্বজন হারানোর কান্না এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাকে মর্মাহত করেছিল।

তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তিনি আশার আলো খুঁজে পেয়েছিলেন শিশুদের মধ্যে। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও তাদের হাসি, খেলাধুলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার মানসিকতা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। শাকিরার মতে, এই শিশুরাই ছিল বাংলাদেশের পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি শুধু উপকূলীয় অঞ্চলই নয়, রাজশাহী-তেও ইউনিসেফ পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। শিশুদের কল্যাণে কাজ করা শাকিরার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Pies Descalzos Foundation, যা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করে আসছে।

ইউনিসেফ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সফরটি ছিল অনেকটাই নীরব ও প্রচারবিমুখ। শাকিরা নিজেই চেয়েছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও শিশুদের বাস্তবতা কাছ থেকে জানতে। সফর শেষে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের দুর্যোগপীড়িত শিশু ও পরিবারগুলোর পাশে আরও জোরালোভাবে দাঁড়ানোর জন্য। তার মতে, সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করতে।

আজ বিশ্বকাপের গান আর মঞ্চকাঁপানো পারফরম্যান্সের জন্য শাকিরাকে যতটা মনে রাখা হয়, বাংলাদেশের উপকূলের অনেক মানুষের কাছে তিনি ততটাই স্মরণীয় একজন মানবিক দূত হিসেবে- যিনি একদিন পটুয়াখালীর শোকাহত শিশুদের গল্প শুনে নিজের চোখের জল লুকাতে পারেননি।

ইউনিসেফবাংলাদেশবিশ্বকাপশাকিরাসিডর