পাহাড়ে বৈসাবির আনন্দ, বিজু মানেই উৎসব

বিজু মানে আনন্দ, হইহুল্লোড়, বিজু মানে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো। বিজু মানে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করা। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন চাকমারা বিজু পালন করেন। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, ম্রোদের চানক্রান, খিয়াংদের সাংগ্রান, খুমিদের সাংক্রাই, চাকমাদের বিজু ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষুর আদ্যাক্ষর নিয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বৈসাবি’। তাই অনেকে এই উৎসবকে সম্মিলিতভাবে ‘বৈসাবি’ বলে থাকেন।
পাহাড়ে এই উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে একটি ফুল, যেটিকে এক নামে সবাই জানে ‘বিজু ফুল’ হিসেবে। বিজু ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Ixora nigrocans। এটি রুবিয়েসি গোত্রের একটি ফুল। পাহাড়ের নানা সম্প্রদায়ের কাছে এই ফুল বেশ কিছু আলাদা নামে পরিচিত। চাকমাদের কাছে এটি ‘ভাতজোড়া’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘কুমুইবোবা’, মারমাদের কাছে ‘চাইগ্রাইটং’ আর সাঁওতালদের কাছে ‘পাতাবাহা’ নামে পরিচিত বিশেষ এই ফুলটি।
সাধারণত চৈত্র মাসের শুরুর দিকে পাহাড়ে দেখা মেলে বিজু ফুলের। পাহাড়ের নানা জায়গায় এই ফুলের দেখা মিললেই বুঝতে হবে নতুন বর্ষ আর বৈসাবি উৎসব তার আগমনী বার্তা দিচ্ছে। বিজু ফুল সাধারণত কলি থাকা অবস্থায় দেখতে হালকা গোলাপি রঙের লাগে। পরিপূর্ণভাবে ফোটার পর ফুলটি দেখতে হয়ে যায় ধবধবে সাদা। এর অসম্ভব সুন্দর রূপ দেখা যায় ফুলটি ফোটার পর।
বিজু ফুলের কদর শুরু হয় বৈসাবি উৎসবের প্রথম দিন থেকে। এই দিনে সাতসকালে জঙ্গল থেকে ফুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে মালা গেঁথে ঘরের মূল দরজা সাজানো হয়। পাশাপাশি এই ফুলের সঙ্গে অন্যান্য ফুল মিশিয়ে কলাপাতায় নিয়ে নদীর বালুচর বা বাড়ির আশপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়াতে প্রার্থনায় বসেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ।
বিজু মূলত তিন দিন পালন করা হয়,ফুলবিজুর দিনে সকাল ও সন্ধ্যায় পাহাড়িদের ঘরে ঘরে জ্বালানো হয় মঙ্গলপ্রদীপ।
এর প্রথম দিন চাকমারা ফুলবিজু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারি বৈসুক, দ্বিতীয় দিন চাকমারা মুলবিজু, মারমারা সাংগ্রাইং আক্যা, ত্রিপুরারা বৈসুকমা এবং তৃতীয় দিন চাকমারা গোজ্যেপোজ্যে দিন, মারমারা সাংগ্রাই আপ্যাইং ও ত্রিপুরারা বিসিকাতাল নামে পালন করে থাকে ঘরে ঘরে। এটি পাহাড়ি জনগণের প্রাণের উৎসব। পার্বত্য এলাকায় এদিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে। ত্রিশ-চল্লিশ রকমের বা তার অধিক তরকারির সংমিশ্রণে পাঁচন রান্না করা হয়।
কাঁচা কাঠালের ইছোড়,শুটকি মাছের তরকারি,দেশি মুরগির ঝোল,কলাপাতার পিঠে,পায়েস,ফল- পানীয়,ঐতিহ্যবাহী খাবার অথিতিদের পরিবেশন ছাড়াও মাছ-মাংস আয়োজন করা হয়ে থাকে। ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে থাকে বিন্নি ধানের খই,পোলাও বিরানি,লুডুস, নাড়ু,সেমাইয়ের পাশাপাশি হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী খাবার।
পাহাড়ের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সকলে দলবলে মেয়েরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফানুস উঠানো,বাড়িঘরের দরজায়, উঠানে, গো-শালায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সকলের জন্য কেয়াংএ কেয়াংএ মঙ্গল কামনা করা হয়।
এছাড়া বিজু উৎসবে পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হয়,প্রত্যেক বছর এ উৎসবকে ঘিরে ,তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে। এসব বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মধ্যে থাকে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, গ্রামীণ পালাগান, পাজন ও পিঠা উৎসব, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রদর্শনী, নাট্যমঞ্চ, চলচ্চিত্র ও সাময়িকী প্রকাশনা।



