বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
স্বাস্থ্য

গরমে আপনিও কি ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকিতে?

Dehydrated-scaled

গরমের দিনে হঠাৎ করেই মাথা ঝিমঝিম করা, ক্লান্ত লাগা কিংবা বারবার পানি পিপাসা পাওয়া- এসব অনেকেরই সাধারণ বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু এসবই হতে পারে শরীরে পানির ঘাটতির প্রাথমিক সংকেত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। অর্থাৎ শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি না থাকলে স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।

ডিহাইড্রেশন তখনই ঘটে, যখন শরীরে যতটা পানি প্রবেশ করে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর দ্রুত পানি হারায়। এছাড়া জ্বর, ডায়রিয়া, বমি কিংবা পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণেও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। কিছু ওষুধের প্রভাবে ঘন ঘন প্রস্রাব হলেও শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আমাদের শরীরের একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে পানি। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় এর ভূমিকা অপরিসীম। মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, পেশি, ত্বক ও ফুসফুস-প্রতিটি অঙ্গেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি থাকে। হজমপ্রক্রিয়া সচল রাখা, শরীর থেকে বর্জ্য অপসারণ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, লালা উৎপাদন, অক্সিজেন পরিবহন, হাড় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সুরক্ষা দেওয়া-সব ক্ষেত্রেই পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের সুরক্ষাতেও পানি প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে।

পানিশূন্যতার লক্ষণ
শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ঠোঁট ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা গাঢ় হলুদ প্রস্রাব হওয়া পানিশূন্যতার সাধারণ লক্ষণ। অনেক সময় চোখ বসে যেতে পারে, ত্বক শুষ্ক ও কুঁচকে যেতে পারে। শিশুরা অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করতে পারে, ঘুম বেশি পেতে পারে এবং দ্রুত শ্বাস নিতে পারে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়াও উদ্বেগজনক লক্ষণ।

বড়দের ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন। ঘন ঘন পানি পিপাসা পাওয়া, মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের প্রস্রাব হওয়া এবং দীর্ঘ সময় প্রস্রাবের বেগ না আসা—এসবই শরীরে পানির অভাবের ইঙ্গিত দেয়। এর পাশাপাশি মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, ঘুমঘুম ভাব এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেকের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, পেশিতে টান ধরে, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয় কিংবা মিষ্টি খাবারের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যও দেখা দিতে পারে।

পানিশূন্যতার ফলে যা হয়
যদিও যে কেউ পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারেন, তবে শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শিশুরা অনেক সময় পিপাসার কথা ঠিকভাবে জানাতে পারে না। অন্যদিকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পানির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে এবং তারা অনেক সময় পিপাসা অনুভবও করেন না। ফলে এই দুই বয়সী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিয়মিত পানি পান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

পানিশূন্যতার মাত্রা বেশি হলে তা শুধু অস্বস্তিই তৈরি করে না, বরং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও ডেকে আনতে পারে। শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, হিট স্ট্রোকের মতো বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কিডনিতে পাথর হওয়া কিংবা কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই লক্ষণগুলো অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যেভাবে প্রতিরোধ করবেন
ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত পানি পান করা। প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করার চেষ্টা করতে হবে। শুধু পিপাসা পেলেই নয়, নির্দিষ্ট বিরতিতে পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। শরীর অতিরিক্ত পানি হারালে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) গ্রহণ করা যেতে পারে।

খাবারের ক্ষেত্রেও কিছু সচেতনতা উপকারী। শসা, লাউ, ডাবের পানি ও টক দইয়ের মতো পানিসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এবং পানির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে হলে শুধু বাইরে থেকে নয়, শরীরের ভেতরের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। আর সেই ভারসাম্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো পর্যাপ্ত পানি পান ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।

ডিহাইড্রেশনপানিপানি শূন্যতাস্বাস্থ্য