বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

বসন্তের রঙের আড়ালে বনে আগুনের দহন

বসন্তের রঙের আড়ালে বনে আগুনের দহন

বসন্ত মানেই রঙের উৎসব—শিমুলের লাল, পলাশের আগুনরাঙা, নতুন পাতার সবুজে ভরে ওঠা বন। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই যেন লুকিয়ে থাকে আরেক বাস্তবতা—নিঃশব্দে জ্বলে ওঠা বন। গাজীপুরের ভাওয়াল অঞ্চলের শাল-গজারি বনে প্রতি বছর বসন্ত এলেই দেখা যায় সেই একই দৃশ্য। শুকনো পাতার স্তূপে আগুন, ধোঁয়ার কুণ্ডলি, আর দাউ দাউ করে পুড়ে যাওয়া প্রকৃতি।

পিচঢালা সড়ক ধরে শ্রীপুর থেকে কালিয়াকৈরের দিকে এগোলে চোখে পড়ে—রাস্তার দু’পাশে গজারি গাছের সারি। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই সেই সবুজের বুক চিরে আগুনের লেলিহান শিখা। আশ্চর্যের বিষয়, এই আগুনের কাছেই থাকে বন রক্ষার বিট অফিস—তবুও আগুন থামে না।

বসন্তের বাতাসে যখন শিমুল-পলাশের রঙ ছড়িয়ে পড়ে কিংবা পত্র ঝরার পর যখন গাছে গাছে নতুন কুঁশি গজানোর সময় হয়, তখনই ভাওয়ালের শাল-গজারি বনের ভেতরে এমন দৃশ্য দেখা যায়। বসন্ত এলেই কেন বনের বুকে এই সর্বনাশা কাণ্ড? কে বা কারা দেয় এই আগুন? স্থানীয়রা বলছেন, সামান্য স্বার্থের জন্য এক শ্রেণির লোভী মানুষ বনে আগুন দেয়, বন পুড়িয়ে ফেলে।

রোববার থেকে মানুষজনকে সচেতন করতে এবং বন না পোড়ার জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু মাইকিং করেই বন রক্ষা করা যাবে কিনা এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

Advertisements

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, স্টেটস অব এনভাইরনমেন্টের তথ্যমতে ২০০০ সালে গাজীপুরে বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। ২০২৩ সালে বনভূমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টর। গত দুই যুগে সবুজ শ্যামল গাজীপুরের পরিবেশের বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।

স্থানীয় বিন্দু বাড়ি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বনভূমি দখল করে নেওয়ার জন্যও কেউ কেউ বনে আগুন ধরিয়ে দেয়। গাছপালা ও ঝোপঝাড় পুড়ে গেলে জমি দখল করতে সুবিধা হয়। অনেক সময় গাছ চুরির সুবিধার জন্যও বন পুড়িয়ে ফেলা হয়।

বনভূমিতে আগুন লাগার অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের অসতর্কতা। অনেক সময় পর্যটক বা বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে যাওয়া লোকজন সিগারেট বা আগুনের অবশিষ্টাংশ ঠিকভাবে নিভিয়ে না রেখে চলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বনভূমিতে আগুন লাগিয়ে থাকে, যাতে বনভূমি পরিষ্কার করে কৃষিজমি বা বসতি স্থাপন করা যায়। আবার অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ বা বনের জমি দখলের উদ্দেশ্যেও এমন ঘটনা ঘটে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে বনাঞ্চলে নজরদারি জোরদার করা এবং বনরক্ষীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বনভূমি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেমন ড্রোন বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আগুন দ্রুত শনাক্ত করা ও কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। স্থানীয়দের বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন করলে তারা বন রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। বনের আগুন নেভানোর জন্য অগ্নিনির্বাপণ দল গঠন ও মোতায়েন করা প্রয়োজন।

প্রকৃতির নিয়মে বসন্ত আসে নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে। কিন্তু মানুষের অসতর্কতা আর লোভ সেই বসন্তকে পরিণত করছে ধ্বংসের ঋতুতে।

শিমুল-পলাশের আগুনরঙা ফুলের সঙ্গে যখন মিশে যায় বনের আগুনের লেলিহান শিখা, তখন বোঝা যায়—এই আগুন শুধু পাতায় নয়, আমাদের দায়িত্ববোধেও লেগেছে।

Advertisements
আগুনগাজীপুরবন