বজ্রপাত: কেন এত প্রাণঘাতী, কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখবেন

বর্ষাকাল বা কালবৈশাখীর সময় বজ্রপাত বাংলাদেশে একটি বড় প্রাকৃতিক ঝুঁকি। আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর পর অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে না গিয়ে খোলা মাঠ, পুকুর বা গাছের নিচে অবস্থান করেন—যা বিপদ বাড়িয়ে দিতে পারে। বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঝড় আসার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া।

বজ্রপাতে মানুষ মারা যায় কেন?
বজ্রপাতের সময় বিপুল বৈদ্যুতিক শক্তি শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বজ্রপাতের কারণে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্বাস বন্ধ হওয়া, গুরুতর পোড়া ও অন্যান্য আঘাত হতে পারে।
শুধু সরাসরি বজ্রপাতেই মানুষ আক্রান্ত হয় না। কাছাকাছি কোনো গাছ বা স্থাপনায় বজ্রপাত হলে সেখান থেকে বিদ্যুৎ শরীরে চলে আসতে পারে। আবার মাটির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিদ্যুৎও আশপাশের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। বিদ্যুৎ তার, ধাতব বস্তু বা পানির পাইপের মাধ্যমেও বজ্রপাতের বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বজ্রপাতের সময় কোথায় যাবেন?
১. গর্জন শুনলেই ঘরে ঢুকুন
বজ্রপাত দেখা না গেলেও বজ্রের শব্দ শোনা গেলে আপনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আছেন। তাই বৃষ্টি শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত একটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ ও মজবুত ভবনে আশ্রয় নিন। জানালা বন্ধ করে ভেতরে থাকুন।
২. ঘরে ঢোকার সুযোগ না থাকলে গাড়িতে আশ্রয় নিন
জানালা বন্ধ থাকা শক্ত ছাদযুক্ত গাড়ি তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে। তবে মোটরসাইকেল, খোলা গাড়ি, টিনের ছোট শেড, বারান্দা বা খোলা ছাউনিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা যাবে না।
বাইরে থাকলে যেসব ভুল করবেন না
গাছের নিচে দাঁড়াবেন না—বিশেষ করে একা দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু গাছের নিচে নয়। কাছের গাছে বজ্রপাত হলে বিদ্যুৎ শরীরে চলে আসতে পারে।
খোলা মাঠে অবস্থান করবেন না।
পুকুর, নদী, হ্রদ বা অন্য কোনো জলাশয়ের কাছে থাকবেন না।
বিদ্যুতের খুঁটি, তার, ধাতব বেড়া বা অন্য পরিবাহী বস্তুর কাছাকাছি থাকবেন না।
মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়বেন না। আশ্রয় না পেলে যত দ্রুত সম্ভব নিচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

ঘরের ভেতরেও সতর্ক থাকতে হবে
অনেকে মনে করেন ঘরে ঢুকলেই সব ধরনের ঝুঁকি শেষ। কিন্তু বজ্রপাত বিদ্যুৎ লাইন, পানির পাইপ বা ধাতব তারের মাধ্যমে ঘরের ভেতরেও প্রবেশ করতে পারে।
তাই বজ্রপাতের সময়—
- গোসল বা কলের পানি ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- বৈদ্যুতিক তারে সংযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবেন না।
- তারযুক্ত টেলিফোন ব্যবহার করবেন না।
- জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকুন।
- কংক্রিটের দেয়াল বা মেঝের সঙ্গে হেলান দিয়ে থাকবেন না।
বজ্রপাত থেমে গেলেই কি বাইরে যাওয়া যাবে?
না। শেষবার বজ্রের শব্দ শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে বাইরে বের হওয়া নিরাপদ। কারণ ঝড় কিছুটা দূরে সরে গেলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকতে পারে।
কেউ বজ্রপাতে আক্রান্ত হলে কী করবেন?
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা নিরাপদ—তার শরীরে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে থাকে না। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ডাকুন। ব্যক্তি শ্বাস না নিলে বা হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে গেলে প্রশিক্ষণ থাকলে সিপিআর (CPR) শুরু করুন এবং সম্ভব হলে AED ব্যবহার করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকার মূল নিয়ম খুব সহজ: “বজ্রের শব্দ শুনলেই ঘরে ঢুকুন।” আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করুন এবং ঝড়ের আশঙ্কা থাকলে আগেই খোলা জায়গার কাজ বা বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরও বজ্রপাত ও সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা প্রকাশ করে।
তথ্যসূত্র: US National Weather Service, CDC এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।



