বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

দেশে স্নাতক বাড়ছে কিন্তু দক্ষ জনবলের সংকট

WhatsApp Image 2025-09-30 at 12.51.07_b2d50cad

বাংলাদেশে দিন দিন বেকারত্বের হার বেড়েই চলছে। প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু যে হারে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ছে সে পরিমান দক্ষ জনবল বের হচ্ছে না। বলা যায়, আমাদের দেশে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে দেশে বেকার স্নাতকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে এ বছর প্রায় ৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। করোনার পরবর্তী সময়ে একসময় বেকারত্ব কিছুটা কমলেও ২০২২ সাল থেকে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। আর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে তরুণ স্নাতকদের ওপর। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬৬ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১.৪৬ শতাংশ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরাই সবচেয়ে এর বড় অংশ।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে যেখানে সম্ভাবনার দ্বার হওয়ার কথা ছিল উচ্চশিক্ষা, কিন্তু সেখানে তা অনেকের জন্য হয়ে উঠছে হতাশার পথ। পরিসংখ্যানের ভেতর চাপা পড়ে আছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা, তরুণরা বছরের পর বছর সময় আর পরিবারের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে উচ্চশিক্ষা নেয়। অথচ কর্মসংস্থানের দরজা বন্ধ থাকে, তখন আশা পরিণত হয় ক্ষোভ আর বিভ্রান্তিতে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৭টি সরকারি, ১১৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গত তিন বছরে ১৯ লাখ স্নাতক তৈরি করেছে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অথচ ২০২৩ সালে বিদেশি পেশাজীবীরা বাংলাদেশ থেকে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার বেতন হিসেবে নিয়ে গেছেন, যা আমাদের নিজস্ব দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।

এর কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন সাধারণ ডিগ্রি প্রোগ্রামে অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি নিচ্ছে। অধিকাংশ স্নাতক এখনও সাদা-কলার চাকরির দিকে ঝুঁকছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পথ অবমূল্যায়িতই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে তরুণরা চাহিদাসম্পন্ন পেশার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জনবল সংকট দেখা দিচ্ছে।

ফলে দেখা যাচ্ছে, স্নাতকরা মর্যাদাসম্পন্ন চাকরির ক্ষুদ্র ভান্ডারে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ছে। আর শিল্প খাত পূরণে বিদেশি দক্ষ জনবল আমদানি করছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প খাত। বিশ্ববিদ্যালয়– শিল্প সহযোগিতা দুর্বল, দক্ষ মধ্য পর্যায়ের সুপারভাইজারের ঘাটতি, আর বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও দায় আছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা আর লেকচারনির্ভর ধারায় আটকে আছে। যেখানে অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীর পরামর্শ, গবেষণা বা বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরিবর্তে রাজনীতিতেই ব্যস্ত। এর ফলে স্নাতকরা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে বের হলেও অভিযোজন ক্ষমতা, সৃজনশীলতা আর সমস্যা সমাধানের দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। ফলে শিল্প ক্ষেত্র ক্রমেই বিদেশি ম্যানেজার আর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করছে।

বাংলাদেশের ‘টি-আকৃতি’ স্নাতক প্রয়োজন। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখার পাশাপাশি যোগাযোগ, দলগত কাজ, নৈতিকতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা দক্ষতায়ও পারদর্শী হবে। এ জন্য শুধু পাঠ্যক্রমের সামান্য পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষণ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন, যেখানে প্রচলিত লেকচারের জায়গায় থাকবে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, সমস্যা সমাধান, ফ্লিপড ক্লাসরুম আর হাতেকলমে অভিজ্ঞতা।

পোশাকশিল্পে নির্ভরতা ছাড়িয়ে বৈচিত্র্যময়, উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব । নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপ্রযুক্তি, ডিজিটাল হেলথ, জলবায়ু-স্মার্ট সমাধান, ফিনটেক, সার্কুলার ইকোনমি আর গিগ ইকোনমিতে কৌশলগত বিনিয়োগ বাংলাদেশকে অনুসারী নয় বরং আঞ্চলিক নেতৃত্বের আসনে বসাতে পারে।

এই রূপান্তরের জন্য উদ্ভাবনী কেন্দ্র গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত আর স্টার্টআপগুলো একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে বিপুল অদক্ষ শ্রমশক্তিকে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। এশিয়ার অনেক দেশ বিশেষত চীন, ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে প্রবেশ করছে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা মিলে যাচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি যেমন রোবটস, এআই আর ডিজিটাল টুইনসের সঙ্গে, স্মার্ট ও টেকসই সমাধান তৈরিতে।

কিন্তু বাংলাদেশ এ প্রতিযোগিতায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়েছে এখন দরকার কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার। ফলে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে।