ছায়ার অমাবস্যা

উঠতে হবে আজও। তবে নিত্যদিনের একঘেয়ে প্রয়োজনে নয়। কেবল নিজের চাওয়ার কাছে ধরা দিতেই আজকের এই ক্ষণ। ঘুম ভেঙে চোখ মেলেই দেখি সকালবেলার মিষ্টি রোদের হাসি ঘরের মেঝেতে লুটোপুটি খা”েছ। সকালের স্নিগ্ধ মায়াময় বাতাস যেন পুরো শহরজুড়ে মায়া ছড়াচ্ছিল। হলুদ জবাটার ছায়া দুলছিল বারান্দার এক কোনে। আমি শুয়ে শুয়ে দেখছিলাম, সেই আলো-ছায়ার খেলা। ব্যস্ত এই নাগরিকজীবনে সকালকে আলাদাভাবে দেখবার কিংবা তাকে নিয়ে আয়েশ করে একটু ভাববার সেই সময় কোথায়! কেবল তো ছোটো আর ছোটো। এই ছুটোছুটিতে জীবন কী পেল বা পেল না সেই বিষয়টি ভাববারও অবকাশ মেলে না। তাই গতকালই ভেবে রেখেছি আজ কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটাব। অন্তত সকালটা। বারান্দায় টবে লাগানো গাছগুলোর সঙ্গে থাকব কিছুক্ষণ। ওরাও হয়তো পুরো সপ্তাহ আমার অপেক্ষায় থাকে। হয়তো তারাও আপনজনের স্পর্শ চায়, ভালোবাসা চায়। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে হাতে এক কাপ চা নিয়ে তাতে চুমুক দিতে দিতে শুনব পছন্দের কোনো গান। কিংবা প্রিয় কোনো বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠায় চোখ বুলাব। এর পরই প্রতিবেশী বেলী আপাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ব।
এই শহরে সেই আমার একমাত্র বন্ধু। যাঁর কাছে মন খুলে কথা বলা যায়। প্রয়োজনে তাঁর সামনে কাঁদাও যায়। ভাবছি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের জন্য কিছু কেনাকাটাও করব। কাজ শেষে দুজনে একসঙ্গে বসে কফি খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা দেব। সপ্তাহে অন্তত একবার নিজেকে আমি এটুকু ট্রিট দিতেই পারি! এছাড়া আর তো কোনো উপায়ও নেই। কেননা আমাকে ট্রিট দেবার মতো একান্ত নিজের কেউ তো কখনো ছিল না, ভবিষ্যতে হবে এটা দুঃস্বপ্নেও এখন আর ভাবি না। তবে এইরকম বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, নৈঃশব্দ্যঘেরা জীবনটা মন্দ না। কারো জন্য বাড়তি কোনো দায়িত্ব পালন করতে হয় না, সকালে উঠে ঘুম জড়ানো চোখে কারো নাস্তা রেডি করা, শার্ট আয়রন করা, তার জন্য বাড়তি প্লেট ধোয়া, অসু¯’তায় সেবাযত্ন করা, এর কোনো কিছুই করতে হয় না বলে ভাবি ভালোই আছি।
আবার মাঝে মাঝে উলটোটাও মনে হয়, একান্ত একজন সঙ্গী থাকলে বোধ হয় মন্দ হতো না। কেন মন্দ হতো না বুঝিয়ে বলছি এই ধরুন কিছুক্ষণ পর শপিংয়ে যাব, নিজের জন্য কিছু পছন্দ হলে কোনটা ছেড়ে কোনটা নেব, এরকম দ্বিধা-দ্ব›দ্ব থেকে যখন মুক্তি মেলাটা কঠিন হয়ে পড়ে সেই মুহূর্তে অন্তত কোনো একটাতে তার হাঁ অথবা না সমর্থনের মধ্য দিয়ে কোনটা নেব সেটা সিলেক্ট করাটা সহজ হতো। ঝুম বৃষ্টি ঝরা রাতে জমিয়ে গল্প করা যেত। কিংবা বিকেলের চা-কফির সঙ্গী হতে পারত। অবশ্য চা কফি নিজেই তো মানুষ অথবা মানুষদের সঙ্গ দিয়েই আসছে, যুগ যুগ ধরে। ভাবিÑএই চা কফি জিনিসটা যদি না থাকত, তবে মানুষ কী করে তাদের সময়গুলো রাঙাতÑআনন্দে বা বেদনায়, ব্যস্ততায় কিংবা অবসরে!
মা-বাবা অবশ্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন, একজন সঙ্গী জুটিয়ে দেবার, কিš‘ শরীরে বাড়তি ওজন রয়েছে বলে কেউ আমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাইল না। তাছাড়া গায়ের রংটাও তো উজ্জ্বল নয়। এই দুর্বলতাগুলো ছিল আশেপাশের মানুষের অকারণ হাসি, ফিসফিসে কথা আর সহজে ঘায়েল করার অস্ত্র। কিশোরীবেলায় ভালোবেসেছিলাম একজনকে। যাকে খুব আপন মনে হতো। একই কলেজে পড়তাম আমরা। শুরুতে বন্ধুত্ব তারপর প্রেম এসেছিল নিঃশব্দে। দিন-রাত একজনকে ঘিরেই আমার সকল চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকত। তার সেই চোখ, কথা বলার ভঙ্গি, ঠোঁটের মিষ্টি হাসি, বাড়ির সামনের পথ দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাওয়াÑসবকিছুই মনে পড়ত বারবার। অজান্তেই যেন সে নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে আমার। তখন খুব ছোট্টো ছোট্টো বিষয়েই আনন্দ পেতাম। ওর একটা মেসেজ, একটা ফোন-কল, দূর থেকে মিষ্টি হেসে চলে যাওয়াÑএ সবকিছুই আনন্দ দিত।
কিছুদিন পর হঠাৎ ছেলেটির আচরণ বদলাতে থাকে। নিজ থেকে ফোন করে না। আমি করলেও সবসময় কল রিসিভ করত না। আর রিসিভ করলেও ভালোভাবে কথা বলত না। স্পষ্টতই বোঝা যেত, সে বিরক্ত হতো। তবুও অবুঝ মন বারেবার তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য কল করেই যেত। গ্রামের চেনা পথে আমার চোখ দুটি তাকে খুঁজে বেড়াত, একবার দেখবার আশায়। কিš‘ তার দেখা মিলত না। কেননা তার দৃষ্টি তখন নতুন কাউকে খুঁজে নিয়েছে। তাই তো একদিন ফোন করে জানিয়ে দিল, ‘তোরে নিয়া বাইর হইতে আমার লজ্জা লাগে, লোকে হাসাহাসি করে।’ কথাগুলো শোনার পর বিশ্বাসই করতে পারিনি। এমনকি কখনো ভাবিওনি এই নির্মম সত্যিগুলো আমার সামনে এভাবে ধরা দেবে। বাইরে থেকে তখন স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে দুমড়েমুচড়ে পড়েছিলাম। কেননা প্রত্যাখ্যান শুধু ফিরিয়ে দেওয়া নয়, বরং যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তাদের হঠাৎ হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় অস্তিত্বের বিপর্যয় ঘটে, নিঃশব্দে। যেখানে হৃদয় পরিণত হয় স্মৃতির ধ্বংসাবশেষে, আর বর্তমান হয়ে ওঠে কেবল অতীতের প্রতি”ছবি। প্রাতটি স্মৃতি এক-একটি কাঁটা, যা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, বেদনা ছড়ায়। তবুও আমি মেনে নিলাম আমার সীমাবদ্ধতাকে। তাছাড়া এখন তো আমাদের সমাজে একটা নোংরা অস্বস্তিকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। স্টাবলিশ লাইফ, কালারফুল কালচার, ব্রাইট ফিউচারের পেছনেই সবাই ছুটছে। ক্যারিয়ার আর গø্যামারের ঝনঝনানি বাজছে পুরো সমাজে। তাই তো এত এত যোগ্য মানুষের ভিড়ে আমার মতো অযোগ্যের ঠাঁই হলো না কারো মনের অথবা ইট-পাথরের ঘরে। আর কন্যার এই বিয়ে দিতে না পারার অপারগতার কারণে বাবা-মাকে প্রতিনিয়তই কথা শুনতে হতো। এমনিতেও তাদের জীবনের এক নীরব ব্যথার কারণ হয়েছিলাম আমি, তার ওপর আমাকে নিয়ে মানুষের পরিহাস সেই ব্যথাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধুমাত্র সে কারণেই আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিজড়ানো প্রাণের শহর ছেড়ে এই শহরে চলে আসি। একটা চাকরি জোগাড় করি, একাই থাকি, একাই বাঁচি।
ভালো কী মন্দ আছি তা ঠিকঠাক না জানলেও কারো যন্ত্রণার কারণ হতে চাইনি বলেই স্বে”ছায় এই নির্বাসন বেছে নিয়েছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, যেন পাহাড়সম ব্যথাভার আমি বহন করে চলেছি। আর তা বইতে বইতে হাঁপিয়ে উঠেছি, ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
হঠাৎ ঘড়ির ঢিংঢং অ্যালার্মে ভাবনার ঘোর কাটে। তাকিয়ে দেখি নয়টা বেজে গেছে। এখনি উঠে তৈরি হতে হবে। এর বেশি দেরি করলে আমার একমাত্র সঙ্গী বেলী আপাকেও আর পাওয়া যাবে না। ছুটির দিন, বলা তো যায় না, ওনাকেও হয়তো অন্য কেউ বুকড করে ফেলতে পারে। যদিও গতকাল রাতেই কথা বলে বুকড করে রেখেছিলাম তাকে। বেলী আপা সুন্দরী। বয়ফ্রেন্ডও আছে। শুনেছি কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিয়ে হবে। তাই বলা তো যায় না কখন আবার বয়ফ্রেন্ড বলে বসে ছুটির দিনটা তার সঙ্গেই কাটাতে হবে। তাহলে তো আমার ছুটির দিনের সকল আয়োজন ভেস্তে যাবে।
বিছানা ছেড়ে উঠে গতকাল রাতের প্ল্যান অনুযায়ী সব কাজ শেষ করি। চা বানাতে গিয়ে দেখি রান্নাঘরের পাশে কাচের জানালার কার্নিশে সাদা আর সোনালি রঙের একটি বিড়াল বসে আছে। চোখে তার বহু প্রত্যাশা আর আকুতি, সে আকুতি যেন এই ঘরের ভেতর আসার। আমি ওর দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে এক কাপ কড়া লিকারের দুধ-চা বানাই। বারান্দায় বসে খেতে খেতে বেলী আপাকে ফোন করে বাসা থেকে বেরুতে বলি। দুজনে পথে নামতেই দেখি সকালের পরি”ছন্ন নীলাকাশ। সেই বিশাল আকাশের কোথাও কোথাও শ্বেতশুভ্র মেঘের ভেলা। কোথাও আবার চলছে আলোর খেলা। রঙের উৎসব যেন ছড়িয়ে রয়েছে সমস্ত আকাশের শরীরজুড়ে।
হঠাৎ ‘ছাই লইবেন ছাই…’ বলে এক মহিলার হাঁক দেওয়াতে আমার মুগ্ধ চোখদুটি আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে। অদূরেই চলে যাওয়া একটা রিকশাকে থামিয়ে উঠে পড়ি দুজনে। রিকশা চলতে থাকে মসৃণ পথ ধরে। পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে সিএনজি, প্রাইভেট কার, দু-একটি পিকআপ ভ্যান।
বেলী আপা জানতে চাইল, ‘কোথায় যাবে এখন?’
‘সারপ্রাইজ দেব তোমাকে। এখন বলব না।’ হেসে জানালাম।
‘বল না!’
‘আরে তেমন কিছু না। একটু শপিং করব। তারপর দুজনে কোথাও বসে কফি খাব। সবশেষে বাসায় ফিরব, ব্যস।’
‘আচ্ছা।’
‘আসলে কী জানো আপা, সারা সপ্তাহ তো সময় পাই না। এই শুক্রবার থেকেই খানিকটা সময় নিজের জন্য রাখি।’ কথাটা শেষ করেই রিকশাচালককে বললাম ‘থামান, থামান।’
আমরা এ্যাসটোরিয়নের সামনে নামলাম। এই ক্লথিং স্টোর থেকে কিছু কেনাকাটা করব ভেবে ভিতরে ঢুকে হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রাখা প্যান্টগুলো দেখছিলাম। বেলী আপাও সঙ্গে থেকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। বললাম, ‘তোমার জন্যও কিছু পছন্দ কর।’ সে খানিক হেসে আবারও চোখ বুলাতে থাকে শোরুমে রাখা প্রোডাক্টগুলোর দিকে। ভেতরে তখনো মানুষের ভিড় নেই। হয়তো এই সকালে আমরাই প্রথম ক্রেতা।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ প্যান্টের একটা ডিজাইন আমার পছন্দ হতেই ট্রায়াল দিতে চাইলে বিক্রয়কর্মী মেয়েটি বলল, ‘এটা আপনার সাইজের হবে না।’
‘ও আচ্ছ।’ তারপর আরো কিছুটা সময় বাকি প্যান্টগুলোতে চোখ বুলিয়ে অন্য আরেকটি দেখিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এটা কি হবে?’
‘না ম্যাডাম, এটাও হবে না।’ ¤øান মুখে জানাল বিক্রয়কর্মী।
বিষণ্ণ মনে আরো একবার প্যান্টগুলো দেখে সেখান থেকে আরেকটি প্যান্ট বাছাই করে হাতে নিয়ে বললাম, ‘এটা ট্রায়াল করতে চাই।’
‘ম্যাডাম, সরি।’
‘কেন?’ জানতে চাইলাম।
বিক্রয়কর্মী আমার মোটা শরীরটার দিকে আরো একবার তাকিয়ে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘ট্রায়াল করতে গিয়ে যদি সেলাই ফেঁসে যায়, তাহলে প্রোডাক্টটা তো আর সেল করতে পারব না।’
কথা শুনে মেজাজটা খারাপ হলেও আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে রই।
বেলী আপা শান্ত এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বিক্রয়কর্মীর চোখে চোখ রেখে বলে, ‘যদি সেলাই ফেঁসে যায়, তার দায়ভার আমার। এখন কি ট্রায়াল করতে দেবেন?’
ততক্ষণে আমার প্যান্ট কেনার বা ট্রায়াল করার কোনো ই”েছই আর নেই। মলিন মুখে বেলী আপার দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে অনেকটা ফিসফিস করেই জানতে চাইলাম, ‘আমি কি খুব মোটা আপা?’
‘আহা! এসব বাদ দাও তো।’ বেলী আপার হাতে রাখা পছন্দের প্যান্টটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল ও, ‘যাও তো, তুমি এটা ট্রায়াল করে এস।’
‘থাক আপা। এটাও হয়তো হবে না। আর আমার ফিগার তো ভালো না। আসলে কী, এগুলো আমাকে ভালোও লাগবে না। চল, বাসায় ফিরে যাই।’
কফি…শব্দটা শেষ হতে না হতেই যেন শেষ অক্ষরটাও অস্পষ্ট শোনা”িছল বেলী আপার কণ্ঠে। মৃদু হেসে বলি, ‘কফির রং যার শরীরে মিশে আছে তার আর বাড়তি কফির প্রয়োজন আছে কি?’
আমার এমন অনাকাক্সিক্ষত জবাবে বেলী আপা চুপ করে গেলেন। মুহূর্তেই মুখরিত এই নগরকে মনে হলো যেন এটি আদিগন্ত কোলাহলমুখর নগর নয়। নিতান্তই নিস্তব্ধ এক রাতের শহর। মিষ্টি সকালটাও বিদায় নিয়েছে। চারিদিকে অন্ধকার। আমরা দোকান থেকে বেরিয়ে বাসায় ফিরে যেতে চাই। অথচ সহসা যেন আমার পা নড়ে না। একসময় মনে হলো আমিও রাতের অমাবস্যায় ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি।


