বাংলাদেশ নারী ফুটবলের অজানা যুদ্ধের গল্প

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের প্রতিটি অর্জনের পেছনে আছে অগণিত সংগ্রাম, লুকানো অশ্রু আর অদম্য স্বপ্ন। মাঠে গোল, সাফল্য আর উল্লাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সেই কষ্টের গল্পগুলো, যেগুলো খুব কম মানুষই জানেন।
মেডেলের আনন্দে বাবার অশ্রু
পল্টনের মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়ামের এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছিলেন খন্দকার আরিফ হাসান প্রিন্স। বাংলাদেশ যুব গেমসে সেদিন তাঁর দুই মেয়ে—আফঈদা খন্দকার আর আফরা খন্দকার—রিংয়ে লড়ছিলেন। সোনার মেডেল জেতার খবর শোনামাত্র আনন্দে ভিজে যায় বাবার চোখ।
আফঈদা এখন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক। তাঁর হাত ধরেই দল প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে।
সাগরিকার ঘরছাড়া স্বপ্ন
ঠাকুরগাঁওয়ের রাঙ্গাটুঙ্গীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম সাগরিকার। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অসম্ভব টান। কিন্তু সমাজ মানতে চায়নি। গ্রামবাসী বলত, মেয়েরা ফুটবল খেললে নষ্ট হয়ে যাবে। বাবাও মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু সাগরিকা হাল ছাড়েননি। ঘর ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। ঘরোয়া নারী লিগে এফসি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হয়ে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেন। সেই পারফরম্যান্সেই নজর কাড়েন জাতীয় দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব–২০ নারী সাফের চ্যাম্পিয়ন দলে খেলেন, পান ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল ফুটবলারের’ পুরস্কার। অথচ একসময় ফুটবল খেলার কারণে বাবার সঙ্গে এক মাস কথা হয়নি তাঁর।
তহুরার ‘ময়মনসিংহের মেসি’ হয়ে ওঠা
ময়মনসিংহের কলসিন্দুরের ফুটবলার তহুরা খাতুনের গল্পও কম সংগ্রামের নয়। প্রতিবেশীর কথায় বাবা ফিরোজ মিয়া মেয়েকে খেলতে দিতে চাইতেন না। কিন্তু মাঠে তাঁর দ্রুতগতির ড্রিবলিং আর গোলের দক্ষতা দেখে এলাকাবাসী তাঁকে ডাকল—‘ময়মনসিংহের মেসি’।
সরকার থেকে সাফজয়ী দলকে দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা, সঙ্গে ওয়ালটনের রেফ্রিজারেটর। এত বড় পুরস্কার পেয়ে বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন বাবা। অবশেষে মেয়ের প্রতিভার কাছে নতজানু হয়ে তিনি আর বাধা দেননি।
মারিয়ার মায়ের অদম্য লড়াই
মারিয়া মান্দার ফুটবলের পেছনে রয়েছে মায়ের ত্যাগের গল্প। বাবা মারা গেলে ছোট ভাইকে গর্ভে নিয়েই সংসারের ভার কাঁধে নেন মা এনতা মান্দা। দিনে ২০০ টাকার বিনিময়ে ধান লাগানো আর কাটা কাজ করতেন। অভাবের সংসারে চাল বিক্রি করে মেয়ের জন্য কিনেছিলেন ফুটবল বুট।
ভোরে নদী পার হওয়ার জন্য মাঝি না পেলে নিজেই নৌকা বেয়ে মেয়েকে পৌঁছে দিতেন অনুশীলনের মাঠে। সেই মারিয়া এখন দেশের জাতীয় দলের মিডফিল্ডের নির্ভরযোগ্য ভরসা।
পাহাড়ি গ্রামে ঋতুপর্ণার সংগ্রাম
রাঙামাটির মগাছড়ি গ্রামের মেয়ে ঋতুপর্ণা চাকমার জীবনে কষ্ট যেন নিত্যসঙ্গী। ১১ বছর বয়সে বাবা ক্যানসারে মারা যান। একমাত্র ভাইও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। অসুস্থ মাকে নিয়েই আজ সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
সরকার থেকে একটি জায়গা বরাদ্দ পেলেও বাড়ি নির্মাণ আটকে আছে মন্ত্রণালয়ের ফাইলে। স্বপ্ন ছিল নিজের এলাকায় একটি ঘর হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনো অসম্পূর্ণ।
আবাসনের সংকট
নারী ফুটবলারেরা দেশের হয়ে গৌরব বয়ে আনলেও তাঁদের থাকতে হয় কষ্টকর পরিবেশে। বাফুফের চতুর্থ তলায় মাত্র ১১টি কক্ষে ঠাসাঠাসি করে থাকেন প্রায় ৭০ জন খেলোয়াড়। নেই লিফট, প্রতিদিন অনুশীলন শেষে ক্লান্ত শরীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সাবেক ফুটবলাররা বলছেন, তাঁদের আবাসনের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। বাফুফে অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে ভবিষ্যতে আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সামনে এশিয়ান কাপ, চোখ বিশ্বকাপে
আগামী মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় বসছে নারী এশিয়ান কাপ। বাহরাইন, মিয়ানমার আর তুর্কমেনিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ জায়গা করে নিয়েছে মূল পর্বে। এবার লক্ষ্য আরও বড়—বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক।
এশিয়ান কাপে সেরা ছয়ে থাকলেই ২০২৭ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হবে। আর সেরা আটে থাকতে পারলে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকেও খেলতে পারবে বাংলাদেশ।
উল্লাসের আড়ালের গল্প
ঋতুপর্ণা চাকমা যখন রংধনু শটে গোল করেন বা সাগরিকা হ্যাটট্রিক করেন, উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা দেশ। কিন্তু এই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে অজানা কান্না, ত্যাগ আর প্রতিদিনের লড়াই।
নারী ফুটবলাররা শুধু মাঠে লড়েন না, তাঁরা লড়েন পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, অভাব-অভিযোগের সঙ্গেও। তাঁদের সেই অদম্য সংগ্রামেই বাংলাদেশ নারী ফুটবল আজ দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্ব দরবারের দুয়ারে।



