Skip to content

২২শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

জ্ঞানের দর্পে যেন ভাস্বর গ্রীক সরস্বতী অ্যাথেনা

"তার শুভ্র পেঁচার ডাক নৈঃশব্দ্য ভেঙে

কোনো রহস্যের সন্ধান দেয় কি?

সকল সৈন্যের এবং জ্ঞানীদের মাঝে সমাদরের ঠাঁই তার,

যেন বল্গা হরিণী,

ব্যাধের ক্ষমতা নেই রুখে দেয়ার সেই গতি।

তার চোখের দ্যুতিতে কি দেখি?

সে কি কান্নার নোনা জল, নাকি রক্ত?

ঝড়ের পূর্বাভাস দেয় যে লালচে আকাশ,

সে আকাশেরই রক্ষাকর্ত্রী, হাজারো স্বপ্নের কারিগর,

সবাই তাকে বলে, অ্যাথেনা।"

 

প্রাচীন গ্রিক পুরাণের দিকে তাকালে অসংখ্য দেব-দেবীর আখ্যান পাওয়া যাবে। এর মাঝে গ্রীক দেবী অ্যাথেনার গল্পের অভাব নেই। জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনাকে অনেক বাঙালী কবি সরস্বতী বলেও ডেকে ফেলেন। তবে অ্যাথেনাকে নিয়ে আছে হাজারো রহস্য। দেবরাজ জিউসের কাছেই একবার অ্যারিস অভিযোগ করেন, "আপনার মেয়ে ভীষণ অবাধ্য প্রভু। জগতে তার অন্যায়ের পাল্লা ক্রমশ ভারি হয়ে চলেছে। অলিম্পাস পর্বতের কেউই আপনার অবাধ্য হওয়ার সাহস পাবেনা। অথচ অ্যাথেনা আপনাকে কোনোরকম শ্রদ্ধাই প্রকাশ করে না।" 

 

এমনিতে সর্বশক্তিমান জিউস তার মেয়েকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিতেন। তবে একদম শুরুতে অ্যাথেনার জন্মতে তার সায় ছিলোনা। এর পেছনে অবশ্য একটি গুরুতর কারণ ছিলো। এক ভবিষ্যদ্বাণী থেকে তিনি জানতে পারেন, মেটিসের গর্ভে যে কন্যা সন্তানের জন্ম হবে, সে প্রজ্ঞায় জিউসের সমকক্ষ হবে। নিজেরই মেয়ের কাছে বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে জিউসের বেজায় আপত্তি। আর অ্যাথেনার জন্ম রুখে দেয়ার জন্যেই তিনি শুরু করেন ষড়যন্ত্র। গ্রিক পুরাণে ষড়যন্ত্রের এই ডামাডোলেই প্রভাবিত গ্রিক উপকথা।

 

 

জিউসের স্ত্রী ছিলেন হেরা। তবে হেরার প্রতি জিউস কখনই বিশ্বস্ত ছিলেন না। তার নারীলোলুপ চরিত্রের উপাখ্যান গ্রীক পুরাণে বহুল প্রচলিত। নিজ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত না থাকার ফলেই গ্রিক উপাখ্যানের বৈচিত্র্য এবং কলেবর ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। সে যাই হোক, জিউসের রোমান্টিক মনে এক সময় টাইটাস ওশেনাস এবং টাইটানেস টেথিসের সমুদ্রকন্যা মেটিস স্থান করে নেয়। মেটিসকে গ্রীক পুরাণে দ্বিতীয় যুগের টাইটান দাবি করা হয়। সম্পর্কের হিসেবে মেটিস জিউসের বোন হন। মেটিস নিজেও ছিলেন জ্ঞানের দেবী। বয়সেও তিনি জিউসের বড় ছিলেন। অনেকে বলেন মেটিস জিউসের জীবনের প্রথম ভালোবাসা। 

 

যেহেতু মেটিস জ্ঞানের দেবী তাই তিনি জিউসের চরিত্র বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু জিউসের ব্যক্তিত্ব এবং আকর্ষন ক্ষমতায় তিনি সাড়া না দিয়ে পারেন নি। ঠিক এসময় জগতের আদিমাতা গাইয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী জিউসকে যথেষ্ট ঘাবড়ে দেয়। কারণ ভবিশ্যদ্বাবী জানায়, মেটিসের গর্ভের প্রথম সন্তান হবে কন্যা যে কিনা বুদ্ধিমত্তা এবং বলে জিউসের সমকক্ষ হবে। মেটিসের দ্বিতীয় সন্তান হবে একজন পুত্র যে কিনা একদিন জিউসকে হটিয়ে দেবতাদের কর্তৃত্ব দখল করে নেবে।

 

জিউসের প্রেম এবং আঁকুতি এবার মিলিয়ে গেলো। তিনি ভাবতে শুরু করলেন তার পিতা ক্রোনাসের মতোই মেটিসকে জ্যান্ত গিলে ফেলবেন। মেটিসকে অবশ্য এত সহজে জিউস গিলে ফেলতে পারেন নি। জ্ঞানের দেবী মেটিস সবসময় সতর্ক থাকতেন। তবে একদিন তিনি সন্তানের জন্য কাপড় বুনতে শুরু করলে জিউস আসেন। অন্যমনস্ক হওয়ার দরুন একসময় জিউস মেটিসকে গিলে ফেলেন। কিন্তু মেটিস জিউসের পেটে তার কাপড় বোনা অব্যাহত রাখেন।

 

সেই বুননের শব্দে জিউসের মাথাব্যথা হয়। প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে জিউস ট্রাইটন নদীর পাড়ে ঘুরতে গেলেন। তার যন্ত্রণাকাতর শব্দ শুনে দেবদূত হার্মিস তরিঘরি চলে আসেন। জিউসের নির্দেশেই হার্মিস দেব কারিগর হেফাস্টাসকে খবর পাঠান। হেফাস্টাস এসে জিউসের মাথা কোপ দিয়ে আলগা করে ফেলেন।

 

এ তো গেলো অ্যাথেনার জন্মের বিবরণ। এবার চলুন অ্যাথেনাকে নিয়ে গড়ে ওঠা কিছু পুরাণের কাহিনী জেনে নিই।

 

এরিকথোনিয়া ও অ্যাথেনা

 

 

অ্যাথেনা নিজের কুমারীত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকতেন। কিন্তু দেব কারিগর হেফাস্টাসের জন্যে একবার তাকে কুমারীত্ব হারাবার পর্যায়ে পৌঁছুতে হয়। হেফাস্টাস সৌন্দর্য্যের দেবী আফ্রোদিতির স্বামী। তবে একবার অ্যাথেনা তার কাছে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করতে এলে হেফাস্টাস দেবীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে মিলিত হতে চান। এসময় হেফাস্টাসের বীর্য তার উরুতে পড়লে তিনি তা রুমাল দিয়ে মুছে নেন। তবে পৃথিবীমাতা গাইয়ার উর্বরতার জন্যেই এক বাচ্চা জন্ম নেয়। অ্যাথেনা এই শিশুর দায়ভার গ্রহণ করেন এবং এর নাম দেয় এরিকথোনিয়াস। 

 

তিনি এই শিশুটিকে একটি ঝুড়িতে রেখে অ্যাথেন্সের রাজার কাছে পাঠিয়ে দেন। অবশ্য তিনি নির্দেশনা দেন ঝুড়ির ঢাকনা যেন না খোলা হয়। তবে অ্যাথেন্সের রাজার তিন মেয়ে দেবীর নির্দেশ না মেনেই ঢাকনা খুলে ফেলেন এবং এরিকথোনিয়াসকে দেখে ভয়ে পালায়। তারা তিনজনই পরে দুর্গ থেকে পড়ে মারা যান। এই খবর এক সাদা কাক অ্যাথেনাকে পৌঁছে দিলে দেবীর অভিশাপে সে কালো হয়ে যায়। অবশ্য পরে এরিকথোনিয়াস এথেন্সের রাজা হন এবং ইতিহাসে ব্যাপক অবদান রাখেন।

 

প্রতিশোধপরায়ন অ্যাথেনা

 

 

লিডিয়া শহরেই আরাকনি নামে এক সুন্দরী নারীর বাস। তার রূপ এবং তাঁতকার্যের জন্যে ব্যাপক সুনাম। শোনা যায় তার সুতো বোনার কাজ দেখতে নিম্ফরাও এগিয়ে আসতো। আর এই দক্ষতা নিয়ে তার ভীষণ গর্ব। যদিও এই বুনন শিল্প গ্রীক উপকথা অনুযায়ী অ্যাথেনার অবদান। তিনিই মানুষকে বুনন শেখান। এক নিম্ফ একদিন বলে ফেলেন, আরাকনি সম্ভবত অ্যাথেনা থেকেই কাজ শিখেছেন। তবে আরাকনি অহংকারে বলে, অ্যাথেনা থেকে সে অনেক দক্ষ বুননশিল্পী। স্বভাবতই দেবী এই উদ্ধত নারীর কথায় খুশি হননি।

 

 

তাই দেবী এক বৃদ্ধার ছদ্মবেশে আরাকনির কাছে এসে এই উদ্ধতভাব পরিহারের অনুরোধ করেন। কিন্তু আরাকনি উলটো বাজে কথা শুনিয়ে দেয়। পরবর্তীতে দেবী স্বমহিমায় আবির্ভূত হলেও আরাকনি তার অহংকার ধরে রাখে। এবার দুজনের মধ্যে সুতো বুননের প্রতিযোগিতা হয়। স্বভাবতই আরাকনি হেরে যায় এবং শাস্তি হিসেবে তাকে মাকড়শা বানিয়ে ফেলা হয়। সেই থেকে মাকড়শা এখনো জাল বুনে যায়। 

 

ডিডেলাসের ঈর্ষা

 

 

অ্যাথেন্সে ডিডেলাস নামে একজন প্রতিভাবান স্থপতি ছিলেন। এমনিতে এই জ্ঞান তিনি অ্যাথেনা থেকেই পেয়েছিলেন। তার ভাগ্নে পারডিক্স একসময় ডিডেলাসের সাথে থাকতে এবং কাজ শিখতে আসে। খুব দ্রুতই পারডিক্স তার মামার দক্ষতার কাছাকাছি চলে আসে। এতে ডিডেলাস ঈর্ষা অনুভব করে। তাই একসময় ছক কষে ভাগ্নেকে অ্যাক্রোপলিস ভ্রমণের সময় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। অ্যাথেনা শ্যেন দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারই নির্দেশে পারডিক্স পাখি হয়ে প্রাণ রক্ষা করে। এবং ডিডেলাসকে শাস্তি হিসেবে পারডিক্স পাখির আকার তার মুখে এঁকে দেন। দেখান থেকেই প্রাচীন গ্রীসে খুনিদের মুখ এমন এঁকে দেয়া হতো।

 

অ্যাথেনার অভিশাপ ও মেডুসা

 

 

গ্রীক পুরাণে মেডুসা এক আতঙ্কের নাম। অ্যাথেনার অভিশাপেই তিনি সর্পকেশরী দানব হয়ে ওঠেন। তবে এ নিয়ে দুটো গল্প প্রচলিত। একটি হলো তিনি একবার অ্যাথেনাকে বলেছিলেন, মেডুসা রুপসী বলে অ্যাথেনা তাকে ঈর্ষা করেন। এতে ক্ষিপ্ত অ্যাথেনা তাকে অভিশাপ দেন। আরেকটি গল্প হলো, সমুদ্রদেব পসাইডন মেডুসার সাথে অ্যাথিনার মন্দিরে মিলিত হন। আর তার এই অপমানের ভার মেডুসার ঘড়ে বর্তে যায়। এ নিয়ে অবশ্য নানা কথা প্রচলিত আছে।

 

 

দেবী অ্যাথেনার সবচেয়ে বড় বিবরণ আমরা পাই গ্রিক কবি হোমারের "ইলিয়াডে।" বিশেষত ট্রোজান যুদ্ধে তার ব্যাপক অবদান ছিলো। এমনকি হারকিউলিসের অভিযানেও দেবী অ্যাথেনার প্রত্যক্ষ ভূমিকা লক্ষণীয়। তবে গ্রীক পুরাণে দেবী অ্যাথেনাকে নিয়ে রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। তার জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তার জোরেই গ্রিকরা তাদের সংস্কৃতিতে অসংখ্য নিয়ম এবং যাপিত অনুষজ্ঞ খুঁজে পেয়েছে। এমনকি আধুনিক সময়েও আমরা পাশ ফিরে তাকাই পুরাণে। যেখানে জ্ঞানের দর্পে এক অপ্সরার মুখ কল্পনা করতে হয় – অ্যাথেনা। 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ