নারীদের দ্বীপ কিহনু
বল্টিক সাগরের মাঝে ছোট্ট একটি দ্বীপ। ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়ার এই দ্বীপটির নাম কিহনু। অন্য দ্বীপের চেয়ে একটু আলাদা এই দ্বীপটি। দ্বীপটির বিশেষত্ব হল এখানে রাজত্ব করছেন কেবল নারীরা। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে শাসন পর্যন্ত এখানে সব কাজই করে নারীরা। কেবল রাজত্বই নয়, এখানকার সব কাজ করেন তারা। দ্বীপের নিরাপত্তা-ভালোমন্দ সব কিছুই দেখাশুনা করছেন তারা। যেকোন পেশাতেই তারা প্রমাণ করেছেন পুরুষ ছাড়াও তারা সব কাজ করতে পারেন। মাতৃতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় এই দ্বীপের জীবনধারা থেকে শুরু করে সকল কিছু।
এ দ্বীপে রয়েছে চারটি গ্রাম। লেমসি, লিনাকেলা, রুটসিকলা এবং স্যার। প্রতিটি গ্রামের বাসিন্দা নিজেদের লোক ঐতিহ্য ধারণ করেন। নারীশাসিত দ্বীপটির আয়তন ১৬.৩৮ বর্গকিলোমিটার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এই দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র ৬০৪ জন। এই দ্বীপে নারীর ক্ষমতায়নের একটি ইতিহাস রয়েছে।
বহু শতাব্দী আগে থেকে এখানে কোন খাদ্য ও অর্থ ছিলনা। ফলে এসবের সন্ধানে পুরুষদের পারি জমাতে হয় সমুদ্রে। পুরুষদের সমুদ্রযাত্রায় চলে যেত অনেক সময়। দিনের পর দিন ঘর ছাড়া থাকতেন তারা। কখনো সপ্তাহ, কখনো মাস, কখনো বা প্রায় বছর কেটে যেত পুরুষদের ছাড়া। তাই এই সময়গুলোতে দ্বীপের সকল কাজ সামলাতে হতো নারীদেরই। জীবিকা নির্বাহ তথা মাছধরা এবং শিকার করার জন্য দূরদেশে পাড়ি দিতেন তারা। এতে নারীরা স্বনির্ভর, শক্তিশালী ও স্বাধীন হয়ে ওঠে।
কিহনু দ্বীপটি একেবারেই পুরুষশূন্য নয়। এখানে পুরুষেরাও থাকে। এখানকার পুরুষরা মৎস্যশিকারি। আর এ জন্য তারা সমুদ্রে থাকেন মাসের পর মাস।
বর্তমানে এই দ্বীপের পুরো অর্থনীতি নারীদের ওপর নির্ভরশীল। এখানকার পুরুষদের মূল উপার্জন ছিল মাছ। কিন্তু বিশ্বায়নের কারণে তাদের মাছের কাজে বিপর্যয় দেখা দেয়। অধিকাংশই তাদের কাজ হারায়। আবার অনেকের আয়ও অনেক সামান্য। এই অবস্থায় সংসারের আর্থিক দায়িত্বও চলে আসে নারীদের ওপর।
এই গ্রামের নারী পুরুষ সবাই সমান। তারা সবাই সবাইকে সমানভাবে সম্মান করেন। এখানকার মহিলারা শিশু লালন-পালনের পাশাপাশি কৃষিকাজ, মাছধরা এবং হস্তশিল্পের মতো কাজ করে থাকেন। দ্বীপের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে মহিলারাই সমস্ত কিছু করে থাকেন। মোটরবাইক চালাতে খুব পছন্দ করেন এখানকার নারীরা।
এখানকার বাসিন্দারা তাদের লোক ঐতিহ্যকে ধারণ করে চলে। নারীরা সবসময় ঐতিহ্যবাহী কিহনু পোশাক পরিধান করেন। শুধু নিজেরাই তা করেন না। পরবর্তী প্রজন্মকেও তারা একই শিক্ষা দেন। কিহনুর শিশুরা স্কুলে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি শেখার পাশাপাশি অধ্যয়ন করে ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত। দ্বীপের সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তার নিদর্শন। তারা তাদের সংস্কৃতির ব্যাপারে বেশ সজাগ। কিহনুর নারীদের এই জীবনাচার, সংস্কৃতি ধারণ দেখে মুগ্ধ হয়ে ২০০৩ সালে ইউনেস্কো এই দ্বীপকে সংস্কৃতির জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে ।
নারী পুরুষ বৈষম্যকারী এই পৃথিবীর কাছে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এই কিহনু দ্বীপ।