৫ নভেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২০ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

কেউ বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমান, কারও লাগে ঘণ্টা—কারণ কী?

There’s no time like nap time

পরিচিতদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যারা বালিশে মাথা রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। আবার কারও কারও ঘুম আসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও ঘুমের দেখা মেলে না। মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার সময়ের এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নানা কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম আসা মূলত শরীরের ক্লান্তি, মানসিক প্রশান্তি এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির (বডি ক্লক) ওপর নির্ভর করে। তবে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া মানেই যে শরীর সুস্থ বা ঘুমের মান ভালো, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতিরও লক্ষণ হতে পারে।

ঘুমাতে কতক্ষণ লাগা স্বাভাবিক?

সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ঘুম আসতে ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগতে পারে। তবে পাঁচ মিনিটের কম সময়ে নিয়মিত ঘুমিয়ে পড়া ঘুমের ঘাটতির ইঙ্গিত দিতে পারে। অন্যদিকে, প্রতিদিন ঘুমাতে ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগলে সেটিও ঘুমের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

২০২৩ সালে ‘স্লিপ মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ১১০টি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দলের ওপর গবেষণা করা হয়। দিনের বেলার ঘুম পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘুমাতে যাওয়ার পর গড়ে প্রায় ১২ মিনিটের মধ্যে ঘুম আসে। গবেষকদের মতে, খুব কম সময়ে ঘুমিয়ে পড়া দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার ইঙ্গিত দিতে পারে। ঘুমাতে যাওয়ার পর ঘুম আসতে যে সময় লাগে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে বলা হয় ‘স্লিপ ল্যাটেন্সি’।

কেন কেউ কয়েক মিনিটেই ঘুমিয়ে পড়েন?

Advertisements

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে।

প্রথমত, দীর্ঘ সময় জেগে থাকলে মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের রাসায়নিক জমা হয়। এটি ঘুমের তাড়না বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীর যত বেশি ক্লান্ত হয়, ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতাও তত বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হয়। তখন বিছানায় যাওয়ার পরপরই ঘুম চলে আসতে পারে। এ ছাড়া সারাদিনের শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত শরীরচর্চা, মানসিক চাপ কম থাকা এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাসও দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।

জিনগত বৈশিষ্ট্য ও বয়সের কারণেও মানুষের ঘুমের ধরনে পার্থক্য দেখা যায়। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা থাকতে পারে।

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া কি ভালো লক্ষণ?

সবসময় নয়। প্রায় প্রতিদিন এক-দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া এবং দিনের বেলাতেও অতিরিক্ত ঝিমুনি অনুভব করা পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

এমনকি দিনের বেলায় কাজের মধ্যে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা স্লিপ অ্যাপনিয়া বা নারকোলেপসির মতো সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই নিয়মিত এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কেন কারও ঘুম আসতে দেরি হয়?

ঘুম আসতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা। উদ্বেগের কারণে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এতে মস্তিষ্ক সজাগ থাকে এবং ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায়।

২০২২ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনাও ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ শুধু দুশ্চিন্তা নয়, আনন্দদায়ক কোনো ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজনাও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

এ ছাড়া আরও কিছু বিষয় ঘুম আসতে দেরি করায়। যেমন—

  • শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির অসামঞ্জস্য: যারা রাতে দেরি করে ঘুমাতে অভ্যস্ত, তাদের স্বাভাবিক ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
  • ক্যাফেইন: চা-কফিতে থাকা ক্যাফেইন অ্যাডেনোসিনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।
  • অনিয়মিত রুটিন: প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমানো বা সপ্তাহান্তে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে।
  • দিনের বেলা দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো: দুপুরে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুমের চাহিদা কমে যায়।
  • ভারী খাবার ও নিকোটিন: রাতে ভারী খাবার খাওয়া বা নিকোটিন গ্রহণ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অ্যালকোহল সাময়িক ঝিমুনি আনলেও ঘুমের মান নষ্ট করে।
  • অস্বস্তিকর পরিবেশ: ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ কিংবা তাপমাত্রার কারণে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে।
  • ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তা: ঘুম আসছে না—এ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা মস্তিষ্ককে আরও সজাগ করে তোলে।

কোন শারীরিক সমস্যায় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে?

কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণেও ঘুমাতে অসুবিধা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথা।

এ ছাড়া অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, শ্বাসকষ্ট, গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তন ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু ওষুধ, যেমন নির্দিষ্ট অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড ও নাক বন্ধ কমানোর ওষুধও ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সহজে ঘুমাতে কী করবেন?

ঘুমের অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য—

১. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। ছুটির দিনেও সময়ের খুব বেশি পরিবর্তন করবেন না।

২. সকালে সূর্যের আলোয় কিছুক্ষণ সময় কাটান এবং দিনের বেলা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।

৩. ঘুমানোর অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করুন।

৪. ঘুমানোর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ঘরের আলো কমিয়ে দিন। মোবাইল, কম্পিউটার ও টেলিভিশনের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।

৫. শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। ঘুমানোর আগে উষ্ণ পানিতে গোসল, বই পড়া কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

৬. সন্ধ্যার দিকে নিজের দুশ্চিন্তা ও পরদিনের কাজগুলো লিখে রাখুন। এতে ঘুমানোর সময় অতিরিক্ত চিন্তা কমতে পারে।

৭. রাতে ভারী খাবার ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।

৮. বিছানা শুধু ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করুন। বিছানায় শুয়ে কাজ করা বা দীর্ঘ সময় মোবাইল দেখার অভ্যাস বাদ দিন।

৯. ঘুমানোর ২০ মিনিট পরও ঘুম না এলে বিছানা থেকে উঠে মৃদু আলোয় শান্ত কোনো কাজ করুন। ঘুমের ভাব এলে আবার বিছানায় ফিরে যান।

১০. বারবার ঘড়ির দিকে তাকাবেন না। এতে ঘুম না আসার দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া কিংবা ঘুম আসতে দেরি হওয়া—দুটোর পেছনেই শরীর ও মনের নানা বিষয় কাজ করে। তাই শুধু কত দ্রুত ঘুম আসছে, তা নয়; বরং ঘুমের মান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং দিনের বেলায় শরীর কেমন অনুভব করছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

Advertisements