শিশুদের ক্যানসারের ৪ লক্ষণ

শিশুদের মধ্যে ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও রোগটির প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা, সামান্য আঘাত কিংবা দৈনন্দিন ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান অভিভাবকেরা। অথচ শিশুর শরীরে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরে কালশিটে দাগ পড়া এবং শরীরের কোথাও গাঁট বা ফোলা দেখা দেওয়া শিশুদের ক্যানসারের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই শিশুর ক্যানসার হয়েছে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণসহ বিভিন্ন সাধারণ শারীরিক সমস্যার কারণেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিন্তু কোনো লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে, সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকলে কিংবা একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ক্যানসার রিসার্চ ইউকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর ১৪ বছর বা তার কম বয়সি প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশুর ক্যানসার শনাক্ত হয়। দেশটিতে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ক্যানসার। তাই শিশুদের শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়মতো রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শিশুদের ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি লক্ষণকে আলাদাভাবে বিবেচনা না করে শিশুর শারীরিক অবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। অনেক সময় প্রাথমিক উপসর্গগুলো স্পষ্ট না হওয়ায় রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়। এ কারণে অভিভাবকদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশুদের ক্যানসারের চারটি সতর্কসংকেত
শিশুদের শরীরে কয়েকটি অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ক্রমে তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও দুর্বলতা শিশুদের ক্যানসারের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়ার পরও শিশুর ক্লান্তি দূর না হওয়া, স্বাভাবিক খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা আগের তুলনায় কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। বিশেষ করে ক্লান্তির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া আরেকটি সতর্কসংকেত। শিশুর মুখ, ঠোঁট বা ত্বকের স্বাভাবিক রং পরিবর্তিত হয়ে গেলে এবং এর সঙ্গে দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন কারণে ত্বক ফ্যাকাশে হতে পারে। আবার কিছু ধরনের রক্তের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ জানতে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা করানো জরুরি।
তৃতীয়ত, কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরে কালশিটে দাগ দেখা দেওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। শিশুদের খেলাধুলা করতে গিয়ে ছোটখাটো আঘাত লাগা স্বাভাবিক। তবে কোনো আঘাতের ইতিহাস না থাকলেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে বারবার কালশিটে দাগ দেখা দিলে, দাগের সংখ্যা বাড়তে থাকলে কিংবা এর সঙ্গে ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিছু রক্তের ক্যানসারে রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে জড়িত উপাদান বা প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চতুর্থত, শরীরের কোথাও স্থায়ী গাঁট বা ফোলা দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। শিশুর ঘাড়ে, বগলে, পেটে কিংবা শরীরের অন্য কোনো স্থানে গাঁট তৈরি হলে সেটি দীর্ঘদিনেও না কমলে বা ক্রমে বড় হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ ধরনের গাঁটের পেছনে সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর রোগের লক্ষণও হতে পারে। তাই গাঁটের আকার, অবস্থান ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কালশিটে দাগ ও ক্লান্তি থেকে যেভাবে শনাক্ত হয়েছিল রক্তের ক্যানসার
শিশুদের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতার গুরুত্ব বোঝাতে যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সি অ্যামেলিয়া ক্যারলের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তার শরীরে প্রথমে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছিল। পরে চিকিৎসা পরীক্ষায় তার অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল) শনাক্ত হয়। এটি এক ধরনের রক্তের ক্যানসার।
প্রথম দিকে সামান্য শারীরিক পরিশ্রমের পরও অ্যামেলিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়ত এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বিষয়টিকে শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি কিংবা স্কুল থেকে ফেরার পর স্বাভাবিক ক্লান্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার শরীরে কোনো স্পষ্ট আঘাত ছাড়াই কালশিটে দাগ দেখা দিতে শুরু করে।
প্রথম দাগটি দেখা দেওয়ার তিন দিন পর তার পায়ের পেছনের অংশে আরও কয়েকটি দাগ দেখা যায়। একই সঙ্গে ওই স্থানে ফোলা ও ব্যথাও ছিল। নিয়মিত চোখ পরীক্ষার সময় চিকিৎসাকর্মীরা তার চোখে ক্ষুদ্র রক্তনালি ফেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখতে পান। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা হয়। শরীরে কালশিটে দাগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে তার লিউকেমিয়া ধরা পড়ে।
পরবর্তী সময়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে সে সুস্থ হয়ে ওঠার পর্যায়ে রয়েছে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে প্রতি তিন মাস অন্তর তার রক্ত ও অস্থিমজ্জা পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি সে আবারও স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, শিশুদের শরীরে একাধিক অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে সেগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা না করে সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে প্রতিটি শিশুর রোগের লক্ষণ ও অগ্রগতির ধরন আলাদা হতে পারে।
শিশুদের ক্যানসার শনাক্তে ‘তিনের নিয়ম’
শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে যুক্তরাজ্যের চিলড্রেনস ক্যানসার অ্যান্ড লিউকেমিয়া গ্রুপ (সিসিএলজি) কাজ করছে। অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং রোগ শনাক্তে অযথা বিলম্ব কমানোর লক্ষ্যে সংস্থাটি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
এ ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগে চিকিৎসকদের জন্য ‘তিনের নিয়ম’ বা ‘রুল অব থ্রি’ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে কোনো শিশুর তিনটি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, তিনবার আলাদা চিকিৎসা-সাক্ষাতের পরও সমস্যার সমাধান না হলে কিংবা তিন সপ্তাহ ধরে কোনো উপসর্গের স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া না গেলে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়।
এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো, শিশুর শরীরে এমন কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন রয়েছে কি না, যা আলাদাভাবে দেখলে সহজেই উপেক্ষিত হতে পারে, তা শনাক্ত করা। কখনো কখনো একটি উপসর্গ সাধারণ কোনো সমস্যার মতো মনে হলেও একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তবে ‘তিনের নিয়ম’ ক্যানসার নির্ণয়ের কোনো পরীক্ষা নয়। এটি মূলত সম্ভাব্য গুরুতর অসুস্থতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা পদক্ষেপ বিবেচনার একটি পদ্ধতি। শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনটি উপসর্গ দেখা দেওয়া বা তিন সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। গুরুতর বা দ্রুত বাড়তে থাকা লক্ষণ দেখা দিলে আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে
গত কয়েক দশকে শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশের বেশি পাঁচ থেকে ১০ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকে। তবে রোগের ধরন, পর্যায়, শিশুর শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসায় সাড়ার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
রোগ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসকেরা শিশুর অবস্থা অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হওয়ায় তুলনামূলক কম জটিল বা কম নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে একই ধরনের চিকিৎসা বা ফলাফল প্রত্যাশা করা যায় না।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক শিশুর প্রথম উপসর্গ দেখা দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে রোগ শনাক্ত হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে আরও বেশি সময় লাগে, কখনো কখনো কয়েক মাসও পেরিয়ে যায়। উপসর্গের ধরন, রোগের জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে এই সময়ের পার্থক্য হতে পারে।
শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে অভিভাবক ও চিকিৎসকদের সচেতনতা বাড়ানো গেলে রোগ শনাক্তে বিলম্ব কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক উপসর্গের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দ্রুত শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়।
কখন শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে?
শিশুর অস্বাভাবিক ক্লান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে গেলে, কোনো আঘাত ছাড়াই বারবার কালশিটে দাগ দেখা দিলে কিংবা শরীরের কোথাও গাঁট বা ফোলা ক্রমে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক রক্তপাত, ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে বা শ্বাস নিতে গুরুতর সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো কত দিন ধরে রয়েছে, তা হিসাব করে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
মনে রাখতে হবে, শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ সব সময় স্পষ্ট হয় না। আবার এসব উপসর্গের অনেকগুলোই সাধারণ অসুস্থতার কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর শারীরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগের প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ বাড়ে।



