১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

বয়স বাড়ুক, শরীর থাকুক সচল, উপকারী হতে পারে তাই চি

WhatsApp Image 2026-10-15 at 6.49.35 PM

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় কিছু পরিবর্তন আসে। হাঁটাচলায় ধীরগতি, পেশির নমনীয়তা কমে যাওয়া, জয়েন্টে ব্যথা কিংবা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ভয়—এসব সমস্যা অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে। এই সময়ে শরীরচর্চা জরুরি হলেও ভারী ব্যায়াম বা জিমে গিয়ে অনুশীলন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ধীরগতির ব্যায়াম ‘তাই চি’ হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প।

হাত-পায়ের নিয়ন্ত্রিত সঞ্চালন, শরীরের ভার এক দিক থেকে অন্য দিকে সরানো এবং ছন্দময় শ্বাসপ্রশ্বাসের সমন্বয়ে এই ব্যায়াম করা হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে অনুশীলন করলে শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা ও চলাফেরার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি ধীরগতির এই চর্চা মনকে শান্ত রাখতেও সহায়ক হতে পারে।

মার্শাল আর্ট থেকে শরীরচর্চার জনপ্রিয় পদ্ধতি

তাই চি বা তাইজিকুয়ানের উৎপত্তি চীনের মার্শাল আর্টের ঐতিহ্যে। একসময় আত্মরক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে এর অনুশীলন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। তাই চি-র বিশেষত্ব হলো, এতে দ্রুত বা ঝাঁকুনিপূর্ণ নড়াচড়ার পরিবর্তে ধীর, মসৃণ ও নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি ভঙ্গির সঙ্গে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার ছন্দ মিলিয়ে চলতে হয়। তাই অনেকেই একে ‘মুভিং মেডিটেশন’ বা চলমান ধ্যান বলে থাকেন।

এই ব্যায়াম করতে সাধারণত ভারী সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। অল্প জায়গায়, আরামদায়ক পোশাক পরে এবং নিরাপদ পরিবেশে এর প্রাথমিক ভঙ্গিগুলো অনুশীলন করা যায়।

তাই চি শুরু করার জন্য প্রথমেই জটিল ভঙ্গি শেখার প্রয়োজন নেই। সহজ কিছু নড়াচড়া দিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।

Advertisements

১. হাতের নিয়ন্ত্রিত সঞ্চালন: সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত ধীরে সামনে ও ওপরে তুলুন। এরপর আস্তে আস্তে নিচে নামিয়ে আনুন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে করার চেষ্টা করুন।

২. শরীরের ভার স্থানান্তর: দুই পায়ের ওপর সমানভাবে ভর দিয়ে দাঁড়ান। এবার ধীরে ধীরে শরীরের ভার এক পা থেকে অন্য পায়ে সরান। এতে ভারসাম্য বজায় রাখার অনুশীলন হয়।

৩. শরীর ডানে-বাঁয়ে ঘোরানো: কোমর ও শরীরের ওপরের অংশ ধীরে একদিকে ঘুরিয়ে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন। এরপর বিপরীত দিকে একইভাবে ঘুরুন। নড়াচড়ার সময় হঠাৎ মোচড় দেওয়া এড়িয়ে চলুন।

৪. নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ: নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন। এরপর অন্য পা দিয়ে একইভাবে অনুশীলন করুন। যাঁদের ভারসাম্যের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা মজবুত চেয়ার বা হাতল ধরে প্রশিক্ষকের পরামর্শে এই অনুশীলন করতে পারেন।

প্রথম দিকে অল্প সময় অনুশীলন করাই ভালো। শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যেতে পারে। ব্যায়ামের সময় ব্যথা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে।

তাই চি-র পরিচিত তিনটি ধরন

তাই চি-র বিভিন্ন শৈলী রয়েছে। প্রতিটির ভঙ্গি ও অনুশীলনের ধরনে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

ইয়াং স্টাইল: তাই চি-র বহুল প্রচলিত ধরনগুলোর একটি। এতে ধীর, মসৃণ ও প্রসারিত ভঙ্গিতে হাত-পা সঞ্চালন করা হয়। ভারসাম্য ও নমনীয়তার অনুশীলনের জন্য এই শৈলী পরিচিত।

সান স্টাইল: এই পদ্ধতিতে ছোট ছোট পদক্ষেপ এবং মসৃণভাবে এক ভঙ্গি থেকে অন্য ভঙ্গিতে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু অনুশীলন তুলনামূলকভাবে কম গভীর ভঙ্গিতে করা যায়। তবে হাঁটু বা অন্য জয়েন্টে সমস্যা থাকলে কোন ভঙ্গি উপযুক্ত, তা বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ঠিক করা উচিত।

চেন স্টাইল: তাই চি-র প্রাচীন শৈলীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এতে ধীর ও নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গির পাশাপাশি তুলনামূলক দ্রুত নড়াচড়া এবং শক্তি প্রয়োগের অনুশীলনও রয়েছে। তাই নতুনদের জন্য প্রশিক্ষকের কাছ থেকে সঠিক পদ্ধতি শিখে নেওয়া ভালো।

বয়স বাড়লে কেন গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের অনুশীলন?

বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির শক্তি, শরীরের সমন্বয় এবং ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই চি-র মতো নিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম ভারসাম্য ও চলাফেরার দক্ষতা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, অনুশীলনের ধরন এবং নিয়মিত চর্চার ওপর।

কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রোকের পর পুনর্বাসন কিংবা পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখার পরিকল্পনায় তাই চি-র উপযোগী অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ জরুরি। তাই চি কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। এটি অ্যালঝাইমার্স বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে কিংবা বাতের ব্যথা সম্পূর্ণ সারিয়ে দেয়—এমন দাবিরও পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা নেই।

বয়স্কদের সবার শারীরিক সক্ষমতা এক রকম নয়। তাই নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

-হৃদ্‌রোগ, বাতের সমস্যা, মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
-শুরুতে সহজ ভঙ্গি বেছে নিন এবং প্রয়োজনে প্রশিক্ষকের সাহায্য নিন।
-পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই, এমন সমতল জায়গায় অনুশীলন করুন।
-প্রয়োজন হলে মজবুত চেয়ার বা হাতল ব্যবহার করুন।
-শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেবেন না এবং অস্বস্তি হলে বিশ্রাম নিন।
-বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু বয়সের সঙ্গে শরীরের সক্ষমতা যতটা সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করা যায়।

নিয়মিত হাঁটা, উপযুক্ত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং ভারসাম্যের অনুশীলনের পাশাপাশি তাই চি হতে পারে দৈনন্দিন শরীরচর্চার একটি অংশ। সঠিক পদ্ধতি, নিয়মিত অভ্যাস এবং নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার প্রতি সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই বয়স বাড়লেও সচল থাকার পথ আরও সহজ হতে পারে।

Advertisements