১৫ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

ঋতু বদলালেই মাথাব্যথা? জেনে নিন কারণ ও স্বস্তি পাওয়ার উপায়

Closeup of young man touching temples with fingers as if suffering from severe migraine, feeling sick, isolated on gray background

আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হলে দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা কিংবা বর্ষা থেকে শীতের আগমনের সময় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন কিছু মানুষের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আবার যাদের আগে থেকেই মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঋতু পরিবর্তনের সময় ব্যথার তীব্রতা বা ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে।

তবে সব মাথাব্যথার জন্য আবহাওয়ার পরিবর্তনকে দায়ী করা ঠিক নয়। মাথাব্যথার সম্ভাব্য কারণ, এর ধরন এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তা জানা জরুরি।

আবহাওয়ার পরিবর্তনে কেন মাথাব্যথা হয়?

আবহাওয়ার পরিবর্তন সবার শরীরে একইভাবে প্রভাব ফেলে না। কিছু মানুষ পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বিশেষ করে মাইগ্রেনের রোগীদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথাব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন

আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় চাপেরও ওঠানামা হয়। কারেন্ট পেইন অ্যান্ড হেডেক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে, বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন কিছু মাইগ্রেনের রোগীর মাথাব্যথার উদ্দীপক হতে পারে। তবে আবহাওয়ার সঙ্গে মাথাব্যথার সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

Advertisements

তাপমাত্রার ওঠানামা

হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, প্রচণ্ড গরম কিংবা ঠান্ডা আবহাওয়ার সংস্পর্শে এলে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মাথাব্যথা হতে পারে। গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, যা মাথাব্যথার অন্যতম কারণ।

শরীরে পানির ঘাটতি

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। সেই অনুযায়ী পানি পান না করলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে মাথাব্যথার পাশাপাশি তৃষ্ণা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

আর্দ্রতা ও বায়ুর মানের পরিবর্তন

অতিরিক্ত আর্দ্রতায় গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ধুলাবালি, বায়ুদূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান কিছু মানুষের মাথাব্যথা বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে। ঋতু পরিবর্তনের সময় অ্যালার্জির উদ্দীপক উপাদানের সংস্পর্শ বাড়লে নাক বন্ধ হওয়া ও অন্যান্য উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘুমের সময়সূচি, শারীরিক কার্যকলাপ ও খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন আসতে পারে। নিয়মিত খাবার না খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব কিংবা হঠাৎ ক্যাফেইন গ্রহণ কমিয়ে দেওয়া অনেকের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।

আবহাওয়াজনিত মাথাব্যথা নাকি মাইগ্রেন?

মাথাব্যথার ধরন বুঝতে এর সঙ্গে থাকা উপসর্গগুলো খেয়াল করা প্রয়োজন।

টেনশন-টাইপ মাথাব্যথায় সাধারণত কপাল, মাথার দুই পাশ কিংবা পেছনের দিকে চাপ বা টানটান অনুভূতি হয়। ব্যথা সাধারণত মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার হয় এবং বমি হওয়ার প্রবণতা থাকে না।

অন্যদিকে, মাইগ্রেনের ব্যথা মাঝারি থেকে তীব্র হতে পারে। সাধারণত মাথার এক পাশে ব্যথা হলেও দুই পাশেই হতে পারে। শারীরিক কার্যকলাপে ব্যথা বাড়তে পারে। পাশাপাশি বমি বমি ভাব, বমি এবং আলো বা শব্দে অস্বস্তি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা বা ঝিনঝিন করার মতো উপসর্গও দেখা যায়, যাকে অরা বলা হয়।

সাইনাসের সমস্যায় মাথাব্যথার সঙ্গে নাক বন্ধ থাকা, মুখে চাপ অনুভব করা কিংবা নাক দিয়ে ঘন শ্লেষ্মা বের হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে অনেক সময় মাইগ্রেনের ব্যথাকেও সাইনাসের সমস্যা বলে ভুল করা হয়। তাই বারবার মাথাব্যথা হলে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় মাথাব্যথা শুরু হলেই যে সেটি আবহাওয়ার কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিশেষ করে ব্যথা নতুন ধরনের হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা আগের তুলনায় আলাদা মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

ঋতু পরিবর্তনের মাথাব্যথা কমাতে যা করবেন

মাথাব্যথা হালকা হলে এবং আগের পরিচিত ব্যথার মতো মনে হলে কিছু অভ্যাস উপকার দিতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: নিয়মিত পানি পান করুন। গরমে, ব্যায়ামের সময় কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হলে পানির চাহিদার দিকে বিশেষ নজর দিন।

নিয়মিত খাবার খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন। ক্ষুধা ও রক্তে শর্করার মাত্রার পরিবর্তন কিছু মানুষের মাথাব্যথা বাড়াতে পারে।

ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখুন: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

ক্যাফেইন গ্রহণে ভারসাম্য রাখুন: চা-কফি পানের পরিমাণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন আনবেন না। কমাতে চাইলে ধীরে ধীরে কমান।

পরিবেশের দিকে খেয়াল রাখুন: প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় থাকা এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে তীব্র রোদ, ধোঁয়া ও ধুলাবালির সংস্পর্শ কমিয়ে আনুন।

মাথাব্যথার ডায়েরি রাখুন: কখন ব্যথা শুরু হচ্ছে, কতটা তীব্র হচ্ছে, সেদিনের আবহাওয়া কেমন ছিল, কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন, কী খেয়েছেন এবং অন্য কোনো উপসর্গ ছিল কি না, তা লিখে রাখুন। এতে মাথাব্যথার সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসককে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে সুবিধা হবে।

মাঝেমধ্যে হওয়া মাথাব্যথায় ব্যথানাশক ওষুধ উপকার দিতে পারে। তবে ওষুধের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে কিংবা কোন ওষুধ উপযুক্ত তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন। ঘন ঘন ব্যথানাশক সেবন উল্টো মাথাব্যথার সমস্যা বাড়াতে পারে।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?

হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, মাথাব্যথার সঙ্গে জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, কথা বলতে অসুবিধা, দৃষ্টির পরিবর্তন কিংবা শরীরের এক পাশে দুর্বলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন। মাথায় আঘাতের পর মাথাব্যথা শুরু হলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মাথাব্যথার সম্পর্ক থাকতে পারে, তবে নিয়মিত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি উপসর্গের ধরন খেয়াল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। মাথাব্যথা বারবার ফিরে এলে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

Advertisements