১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

পেয়ারা জুসেই কমতে পারে রক্তস্বল্পতা, গবেষণায় মিলল ইতিবাচক ফল

IMG_6230

পেয়ারা শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধেও রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সাম্প্রতিক এক গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আয়রন সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে পেয়ারা জুস পান করলে শুধু আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের তুলনায় রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বেশি বাড়তে পারে। বিশেষ করে কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা কমাতে এটি সম্ভাবনাময় ও সাশ্রয়ী উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে উন্মুক্ত গবেষণা সাময়িকী বিএমজে নিউট্রিশন প্রিভেনশন অ্যান্ড হেলথ-এ। এতে আগে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা একটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। বিশেষ করে কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এ সমস্যার প্রকোপ বেশি। রক্তস্বল্পতার কারণে শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, চিন্তাশক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়।

গবেষকদের মতে, পেয়ারা ভিটামিন সি-এর একটি ভালো উৎস। এই ভিটামিন উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করে। কমলার তুলনায় প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি ভিটামিন সি থাকতে পারে। এ ছাড়া পেয়ারায় রয়েছে ভিটামিন এ, ফোলেট, খাদ্যআঁশ ও সামান্য পরিমাণ আয়রন।

গবেষণায় ২০০০ সালের পর ইংরেজিতে প্রকাশিত বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও আধা-পরীক্ষামূলক গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। এতে মোট ১৭টি গবেষণা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৫টি ছিল আধা-পরীক্ষামূলক গবেষণা এবং দুটি ছিল র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল। ছয়টি গবেষণায় কিশোরী এবং ১১টিতে গর্ভবতী নারীদের নিয়ে কাজ করা হয়েছিল। নয়টি গবেষণায় আয়রন সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে পেয়ারা জুস গ্রহণের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।

পরিমাণগত তথ্য পাওয়া গেছে এমন ১২টি গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৩৫ জন নারী ও কিশোরীর তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পেয়ারা জুস গ্রহণের পর তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা গড়ে প্রতি ডেসিলিটারে ১ দশমিক ৭১ গ্রাম বেড়েছে। আলাদাভাবে কিশোরীদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা গড়ে প্রতি ডেসিলিটারে ১ দশমিক ৫২ গ্রাম এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৮৪ গ্রাম বেড়েছে।

Advertisements

আয়রন সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে পেয়ারা জুস গ্রহণের প্রভাব নিয়ে করা পাঁচটি গবেষণায় দুই দলের ফলাফল তুলনা করা হয়। এক দল পেয়ারা জুস ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করে, অন্য দল শুধু আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে। দুই দলেই ১০২ জন করে অংশগ্রহণকারী ছিলেন। ফলাফলে দেখা যায়, শুধু আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের তুলনায় পেয়ারা জুস ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণকারীদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা গড়ে প্রতি ডেসিলিটারে ১ দশমিক ২৯ গ্রাম বেশি ছিল।

গবেষকদের মতে, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ১ থেকে ২ গ্রাম বাড়লে কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতার তীব্রতা কমে আসতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি কমা, চিন্তাশক্তির উন্নতি ও কাজের সক্ষমতা বাড়ার মতো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, এসব ফলাফল ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত সব গবেষণাই ইন্দোনেশিয়ায় পরিচালিত হয়েছে। গবেষণাগুলোর নকশা, পরীক্ষার সময়কাল, পেয়ারার ধরন, ব্যবহৃত জুসের পরিমাণ এবং অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্যেও পার্থক্য ছিল। এ ছাড়া অধিকাংশ গবেষণাই আধা-পরীক্ষামূলক হওয়ায় পেয়ারা জুস গ্রহণের কারণেই হিমোগ্লোবিন বেড়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের অভাবে এই উন্নতি কত দিন স্থায়ী হয়, সে বিষয়েও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বিএমজে নিউট্রিশন প্রিভেনশন অ্যান্ড হেলথের সহ-মালিক প্রতিষ্ঠান এনএনইডিপ্রো গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর ফুড, নিউট্রিশন অ্যান্ড হেলথের প্রধান বিজ্ঞানী ও নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সুমন্ত্র রায় বলেন, ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার আয়রন শোষণে সহায়তা করে এবং আয়রন সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। গবেষণাটি সেই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকেই আরও সমর্থন করে।

তবে তিনি মনে করেন, গবেষণাগুলোর মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য, অল্পসংখ্যক অংশগ্রহণকারী এবং সীমিত সময়ের পর্যবেক্ষণের কারণে আরও নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন। রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণে পেয়ারা জুসের উপযুক্ত মাত্রা ও ব্যবহারের সময়কাল নির্ধারণের জন্যও আরও পরীক্ষা দরকার।

গবেষকদের মতে, স্কুলের পুষ্টি কর্মসূচি, গর্ভকালীন পরিচর্যা এবং কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্য উদ্যোগে পেয়ারা জুস অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা এই ফল পুষ্টি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে পেয়ারা জুস আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা রক্তস্বল্পতার প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়। আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

Advertisements