সহপাঠীর জন্মদিনে আমন্ত্রণ না পাওয়া শিশুর মন বুঝবেন যেভাবে

স্কুলের বন্ধু কিংবা প্রিয় সহপাঠীর জন্মদিন ঘিরে শিশুদের মধ্যে থাকে নানা পরিকল্পনা। বন্ধুকে কী উপহার দেওয়া যায়, কীভাবে শুভেচ্ছা জানানো হবে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে কী কী করা হবে—এসব ভাবনা তাদের আনন্দিত করে। কিন্তু এত প্রত্যাশার পর যখন তারা জানতে পারে, অন্য বন্ধুরা দাওয়াত পেলেও তার নাম তালিকায় নেই, তখন মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের কাছে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়াকে তারা প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখতে পারে। কেউ নিজেকে অবহেলিত ভাবতে পারে, আবার কেউ মনে করতে পারে, তার মধ্যে হয়তো কোনো সমস্যা আছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো সন্তানের অনুভূতি বোঝা, তাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে সাহায্য করা এবং ঘটনাটি ইতিবাচকভাবে সামলানোর পথ দেখানো।
শিক্ষা ও শিশুমনোবিজ্ঞানী ডা. সাশা হলের মতে, শিশুদের জীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। বিবিসির ‘প্যারেন্টিং ডাউনলোড’ অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সন্তান বড় হওয়ার পথে কোনো না কোনো সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। অভিভাবকেরা সন্তানের সামনে আসা প্রতিটি বাধা দূর করতে পারবেন না, তবে কীভাবে সেই বাধা মোকাবিলা করতে হয়, তা শেখাতে পারেন।
সন্তানকে সব ধরনের হতাশা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা না করে তাকে হতাশা সামলানোর দক্ষতা শেখানো বেশি কার্যকর। এতে ধীরে ধীরে তার মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সামাজিক সম্পর্কের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও সহজ হতে পারে।
কৌতুকশিল্পী, লেখক ও দুই সন্তানের মা ক্যারিয়াড লয়েডও মনে করেন, ছোট শিশুদের কাছে এমন অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কষ্টের হতে পারে। শৈশবে বন্ধুত্ব ও জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে তারা অনেক বেশি আবেগ দিয়ে বিচার করে। তাই দাওয়াত না পাওয়ার ঘটনা প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে ছোট মনে হলেও শিশুর কাছে তা বড় আঘাতের মতো অনুভূত হতে পারে।
সন্তান মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলে প্রথমেই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তার কষ্ট পাওয়াটা স্বাভাবিক। ‘এটা নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে’ কিংবা ‘এত ছোট বিষয় নিয়ে কাঁদছ কেন’—এ ধরনের কথা না বলাই ভালো। বরং মন দিয়ে তার কথা শুনুন এবং কেন তার খারাপ লাগছে, তা বুঝতে চেষ্টা করুন। সন্তানকে বলতে পারেন, ‘তুমি বন্ধুর জন্মদিনে যেতে চেয়েছিলে, তাই দাওয়াত না পেয়ে তোমার খারাপ লাগছে। আমি বুঝতে পারছি।’
এভাবে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিলে শিশু নিজেকে নিরাপদ মনে করে এবং মনের কথা সহজে প্রকাশ করতে পারে। তবে তাকে জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া কিংবা সঙ্গে সঙ্গে মন ভালো করার চেষ্টা করাও ঠিক নয়। কিছুটা সময় দিলে সে নিজেই পরিস্থিতি মেনে নিতে শিখতে পারে।
সন্তানের মন অন্যদিকে ফেরাতে বিকল্প কোনো পরিকল্পনা করা যেতে পারে। যেমন, তার পছন্দের বন্ধুর সঙ্গে খেলতে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া কিংবা বাড়িতে তার পছন্দের কোনো কাজ করা। ডা. হলের পরামর্শ অনুযায়ী, যে অনুষ্ঠানে সন্তান আমন্ত্রণ পায়নি, সেটি নিয়ে বারবার আলোচনা না করে তাকে অন্য আনন্দদায়ক কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।
তবে বিকল্প আয়োজনের উদ্দেশ্য যেন শুধু কষ্ট ভুলিয়ে দেওয়া না হয়। সন্তানকে বোঝাতে হবে, একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পেলেও তার জীবনে আনন্দের অন্য অনেক সুযোগ রয়েছে। কোনো একটি ঘটনা দিয়ে নিজের বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত মূল্য বিচার করা উচিত নয়।
শিশুকে এটিও বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন যে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে। কারও পরিবারের বাজেট সীমিত থাকতে পারে, কেউ ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান করতে পারে, আবার কারও অতিথির তালিকা নির্দিষ্ট থাকতে পারে। ফলে কোনো শিশু দাওয়াত না পেলেই যে তাকে অপছন্দ করা হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
ক্যারিয়াড লয়েডের মতে, সব শিশুই সব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাবে না। আবার অনেক অনুষ্ঠানে তারা আনন্দের সঙ্গে অংশ নেবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা এ ধরনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো বন্ধু দাওয়াত না পেয়ে মন খারাপ করলে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি বুঝতেও শিখবে।
বিশেষ করে পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো সামাজিক ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তারা ভাবতে পারে, হয়তো সে ভালো বন্ধু নয় কিংবা তার মধ্যে কোনো ত্রুটি আছে। ডা. হলের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় শিশুটির নিজের কোনো দায় থাকে না। তাই সন্তানকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, দাওয়াত না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সে খারাপ বা তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় না।
একই সঙ্গে সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অন্য শিশুকে দোষারোপ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। ‘ও তোমার ভালো বন্ধু নয়’ কিংবা ‘ওর সঙ্গে আর কখনো খেলবে না’—এ ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। বরং সন্তানকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে, অন্যের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে এবং প্রয়োজন হলে সম্পর্কের বিষয়ে শান্তভাবে ভাবতে শেখান।
শিশুর বন্ধুত্বের ধরনও বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ডা. হলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর বয়স থেকে শিশুরা অন্যদের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। এ সময় তারা সাধারণত পাশাপাশি খেলাধুলা করলেও পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা সীমিত থাকে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে তারা অন্য শিশুদের সঙ্গে সামাজিকভাবে মিশতে এবং পছন্দের সঙ্গী বেছে নিতে শুরু করে। পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সে বন্ধুত্ব আরও স্থিতিশীল ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
তাই কোনো শিশুকে খেলার মাঠে এক বা দুইবার দেখলেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সম্পর্ক গড়ে তুলতে নিয়মিত যোগাযোগ, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন। অভিভাবকেরা সন্তানকে বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে মেলামেশার সুযোগ দিতে পারেন, তবে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য তাকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব নিয়েও একটি গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে ডা. হল জানান, পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি করতে সময়ের প্রয়োজন আরও বেশি—প্রায় ২০০ ঘণ্টা। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠার জন্য ধারাবাহিক যোগাযোগ ও একসঙ্গে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে বন্ধুত্বের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর দিকেও নজর দিন। সে কী ভালো পারে, কোন কাজে আনন্দ পায় এবং পরিবারের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয় তাকে অনুভব করতে সাহায্য করুন। বন্ধুরা আমন্ত্রণ জানাল কি না, তার ওপর সন্তানের আত্মমর্যাদা নির্ভর করে না—এই ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি করা প্রয়োজন।
তবে কোনো শিশু যদি বারবার সহপাঠীদের কাছ থেকে বাদ পড়ে, নিয়মিত অপমানিত হয় কিংবা স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, তাহলে বিষয়টিকে শুধু সাধারণ মন খারাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন এবং প্রয়োজন হলে শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন। ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান বা হয়রানির ঘটনা ঘটলে যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।



