২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

অল্প ঘুমিয়েও কিছু মানুষ কীভাবে প্রাণবন্ত থাকেন?

VWH-GettyImages-2231401977-ac1aa93b6d20453bb1e359d100170105

বেশিরভাগ মানুষের জন্য রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুম হলে পরদিন ক্লান্তি, অবসাদ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে অল্পসংখ্যক মানুষ আছেন, যাঁরা মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও পরদিন স্বাভাবিকভাবে সতেজ ও কর্মক্ষম থাকেন। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু জেনেটিক বৈশিষ্ট্য।

ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় শরীর বিভিন্ন ধরনের মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজ করে। তাই সাধারণ মানুষের তুলনায় কিছু মানুষ কেন কম ঘুমিয়েও স্বাভাবিক থাকেন, তা জানতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

জিনের সঙ্গে অল্প ঘুমের সম্পর্ক

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকেরা এমন একটি পরিবারের ওপর গবেষণা করেন, যেখানে মা ও তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় কম ঘুমাতেন। গবেষণায় তাঁদের DEC2 জিনে একটি বিশেষ পরিবর্তন বা মিউটেশন পাওয়া যায়। পরে একই ধরনের পরিবর্তন ইঁদুরের মধ্যে তৈরি করলে দেখা যায়, তারাও স্বাভাবিক ইঁদুরের তুলনায় কম ঘুমাচ্ছে।

পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, DEC2 জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে ওরেক্সিন (Orexin) নামের একটি নিউরোপেপটাইডের সম্পর্ক রয়েছে। ওরেক্সিন মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে কিছু মানুষের দীর্ঘ সময় জেগে থাকা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

এরপর ২০১৯ সালে গবেষকেরা ADRB1 নামের আরেকটি জিনের পরিবর্তন শনাক্ত করেন। এই জিন মস্তিষ্কের ডোরসাল পন্স অঞ্চলের কিছু নিউরনে সক্রিয় থাকে, যে অঞ্চল ঘুম ও জাগরণের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় এই জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে কম ঘুমানোর বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক দেখা যায়।

আরও কিছু জিনের সন্ধান

এরপর গবেষকেরা NPSR1 নামের আরেকটি জিনের পরিবর্তনের সন্ধান পান। একটি পরিবারের বাবা ও ছেলে যথাক্রমে প্রায় ৫ দশমিক ৫ ঘণ্টা এবং ৪ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমিয়েও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারতেন। তাঁদের মধ্যে পাওয়া জিনগত পরিবর্তন ইঁদুরের মধ্যে তৈরি করার পরও কম ঘুম ও বেশি সক্রিয়তার মতো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিছু পরীক্ষায় এসব ইঁদুরের স্মৃতিশক্তিও ভালো ছিল।

Advertisements

পরবর্তী গবেষণায় আরও দুটি সম্পর্কহীন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে mGluR1 জিনের পরিবর্তন পাওয়া যায়। গবেষণায় ধারণা করা হয়, এই পরিবর্তনের ফলে মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ বেড়ে যেতে পারে, যা অল্প ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কম ঘুমের অভ্যাস করা যায় না

অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে, শরীরকে কি প্রশিক্ষণ দিয়ে কম ঘুমে অভ্যস্ত করা সম্ভব? গবেষকদের মতে, সাধারণভাবে এর উত্তর না। একজন মানুষের কতটা ঘুম প্রয়োজন, তা বয়স, জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও জিনগত কারণের ওপর নির্ভর করে।

স্নায়ুবিজ্ঞানী এলিজাবেথ বি. ক্লারম্যানের মতে, জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের ঘুমের প্রয়োজনীয়তা ইচ্ছেমতো কমিয়ে ফেলা যায় না। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের আবার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি ঘুম প্রয়োজন।

জোর করে ঘুম কমানো ঝুঁকিপূর্ণ

প্রাকৃতিকভাবে অল্প ঘুমিয়েও ভালো থাকা মানুষ এবং ইচ্ছা করে ঘুম কমানো মানুষ—এই দুই বিষয় এক নয়। কিছু মানুষ জিনগত কারণে স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমিয়েও সতেজ থাকতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমালে চিন্তাভাবনা ধীর হয়ে যেতে পারে, প্রতিক্রিয়ার সময় বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই অন্য কাউকে দেখে নিজের ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলার চেষ্টা না করে, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements