বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী দেখা: ইসলামে কী বলা হয়েছে

বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে দেখা এবং প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে কথা বলার সুযোগ ইসলামে রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও সীমারেখা মেনে চলার নির্দেশনাও রয়েছে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুফতি ও মুহাদ্দিস শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
হাদিসে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নারীকে বিয়ের আগে দেখে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি এক আনসার নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছার কথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানালে তিনি তাকে বিয়ের আগে ওই নারীকে দেখে নিতে বলেন। কারণ, এতে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। (মুসলিম: ১৪২৪, নাসায়ী: ৩২৪৬, আহমাদ: ৭৮৪২)

আরেক হাদিসে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সম্ভব হলে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেওয়া উচিত, যা তাকে বিয়ের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে পারে। (আবু দাউদ: ২০৮২)
কারা পাত্রীকে দেখতে পারবেন
পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে মূলত পাত্রের বিষয়টিই প্রযোজ্য। পাত্রের বাবা, ভাই, দুলাভাই, বন্ধু বা অন্য কোনো নন-মাহরাম পুরুষের জন্য পাত্রীকে দেখা বৈধ নয়—উল্লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া পাত্র যখন পাত্রীকে দেখবেন, তখনও নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। প্রদত্ত মত অনুযায়ী, পাত্রীর চেহারা, দুই হাতের কব্জি এবং পায়ের পাতা দেখা যেতে পারে। এর বাইরে শরীরের অন্য কোনো অংশ, এমনকি চুলও দেখার অনুমতি নেই।
ইবন আবেদীন (রহ.)-এর উদ্ধৃত বক্তব্যেও পাত্রীর চেহারা, দুই হাতের কব্জি ও দুই পা দেখার অনুমতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (হাশিয়া ইবন আবেদীন: ৫/৩২৫)
দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তায় যেসব বিষয় মানতে হবে
পাত্র-পাত্রীর মধ্যে দেখা ও কথাবার্তার ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে—
১. একান্তে থাকা যাবে না
পাত্র ও পাত্রী এমনভাবে একা অবস্থান করতে পারবেন না, যেখানে তারা অন্যদের দৃষ্টির আড়ালে থাকেন।
২. প্রয়োজনীয় ও বৈধ বিষয়ে কথা বলতে হবে
বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বা অনুচিত আলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. ফিতনার আশঙ্কা থাকা যাবে না
কথাবার্তা বা দেখা-সাক্ষাতের কারণে যদি কামভাব বা অনুচিত আকর্ষণের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখতে হবে
নারীর কথা বলার ক্ষেত্রে এমন কোমলতা বা ভঙ্গি এড়িয়ে চলতে হবে, যা অনুচিত আকর্ষণের কারণ হতে পারে।
৫. পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে
উল্লিখিত মত অনুযায়ী, নারী মুখ ছাড়া শরীর যথাযথভাবে ঢেকে রাখবেন এবং হাত ও পায়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত পর্দা বজায় রাখবেন।
৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা নয়
বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যতটুকু তথ্য জানা প্রয়োজন, মূলত ততটুকুই আলোচনা করা উচিত। দীর্ঘ বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।
কী ধরনের প্রশ্ন করা যেতে পারে
কনে দেখার সময় মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা নেওয়া। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধ, জীবনযাপন, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারিবারিক দায়িত্ব, প্রত্যাশা এবং বিয়ের পরের জীবন নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা যেতে পারে।
তবে এমন ব্যক্তিগত বা বিব্রতকর প্রশ্ন করা উচিত নয়, যার সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক নেই। অতিরিক্ত প্রশ্নের কারণে পাত্রী অস্বস্তিতে পড়তে পারেন।
প্রয়োজনীয় তথ্যের কিছু অংশ পাত্রের পরিবারের মাহরাম নারীদের মাধ্যমেও জানা যেতে পারে। এতে সরাসরি প্রশ্নের চাপ কমে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে, বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর দেখা ও কথাবার্তার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পরস্পরকে জানার প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে ধর্মীয় শালীনতা, পর্দা, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং নির্ধারিত সীমারেখা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।



