রাত জাগার অভ্যাসে কি কমতে পারে সন্তান ধারণের সক্ষমতা?

ব্যস্ততা, কাজের চাপ কিংবা মোবাইল-কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে অনেকেরই ঘুমের সময় অনিয়মিত হয়ে গেছে। কেউ নিয়মিত রাত জাগেন, আবার কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমান। দীর্ঘদিনের এমন অভ্যাস শুধু ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতিই তৈরি করে না, প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সঙ্গে শরীরের হরমোন ও জৈবিক ঘড়ির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম নারী-পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কম-বেশি দুটোই হতে পারে সমস্যা
ঘুমের সময় ও সন্তান ধারণের সক্ষমতার মধ্যে একটি সম্পর্কের কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। খুব কম ঘুমের পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘুমের অভ্যাসও কিছু ক্ষেত্রে সন্তান ধারণে দেরির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিদিন ছয় ঘণ্টার কম ঘুমকে অনেক গবেষণায় প্রতিকূল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় সাত থেকে সাড়ে আট ঘণ্টার ঘুমে তুলনামূলক ভালো ফল দেখা গেছে। তবে ঘুমের সময়ের সঙ্গে প্রজনন সক্ষমতার সম্পর্ক ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
কখন ঘুমাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু মোট কত ঘণ্টা ঘুম হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। ঘুমানোর সময়ের নিয়মিততাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একেক সময়ে ঘুমানো বা দীর্ঘদিন রাত জেগে থাকার ফলে শরীরের স্বাভাবিক সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি ব্যাহত হতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে প্রজনন-সম্পর্কিত বিভিন্ন হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে এই জৈবিক ঘড়ির সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমের অনিয়মের কারণে হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন এলে মাসিক চক্র বা ডিম্বস্ফোটনেও প্রভাব পড়তে পারে।
রাতের শিফটে কাজ করলে কী হয়?
যারা নিয়মিত রাতের শিফটে কাজ করেন, তাদের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু গবেষণায় রাতের শিফটে কাজ করা নারীদের মধ্যে মাসিকের অনিয়ম ও সন্তান ধারণে বেশি সময় লাগার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতের শিফটে কাজ করলেই প্রজনন সমস্যা হবে। কাজের সময়সূচি, ঘুমের পরিমাণ, বয়স, জীবনযাপন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও ঘুম জরুরি
প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়টি শুধু নারীদের জন্য নয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় থাকে। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও শুক্রাণুর কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ঘুমের ঘাটতি মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের সঙ্গে শরীরের হরমোনের ভারসাম্যেরও সম্পর্ক রয়েছে, যা প্রজনন স্বাস্থ্যে পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে যা করবেন
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ঘুমের রুটিনে কিছুটা শৃঙ্খলা আনা যেতে পারে—
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
- সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন।
- ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- রাতের শিফটে কাজ করলে নির্দিষ্ট ঘুমের সময় ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
- দিনের বেলায় ঘুমালে ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
- নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকেও নজর দিন।
ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত নাক ডাকা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করাই ভালো।
একইভাবে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও দীর্ঘদিন সফল না হলে শুধু ঘুমের অনিয়মকে কারণ ধরে নেওয়া উচিত নয়। নারী ও পুরুষ উভয়ের বিভিন্ন শারীরিক, হরমোনজনিত ও অন্যান্য কারণে সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও উপযুক্ত পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।



