অসুস্থ শরীরেও অফিসে হাজির, কেন এমন করেন কর্মীরা?

শরীর খারাপ, জ্বর বা দুর্বলতা—তারপরও অফিসে হাজির হচ্ছেন অনেকে। কেউ আবার অসুস্থ শরীর নিয়েই বাসা থেকে কাজ চালিয়ে যান। চাকরির প্রতি দায়িত্ববোধ, সহকর্মীদের কথা কিংবা চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা—এমন নানা কারণে অসুস্থ হলেও ছুটি নিতে চান না অনেক কর্মী।
অসুস্থ অবস্থায় কাজে উপস্থিত থাকার এই প্রবণতাকে কর্মক্ষেত্রের গবেষণায় ‘সিকনেস প্রেজেন্টিজম’ বলা হয়। অর্থাৎ শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে কাজ করা। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের প্রবণতা বেশ উল্লেখযোগ্য বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

তরুণদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখায়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মীরা অসুস্থতার কারণে গড়ে ২ দশমিক ৪ দিন কাজে অনুপস্থিত ছিলেন। একই সময়ে ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই গড় ছিল ৬ দশমিক ২ দিন।
বয়সভেদে এই পার্থক্যের পেছনে চাকরির ধরন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মজীবনের শুরুতে থাকা অনেক তরুণ এমন চাকরিতে থাকেন যেখানে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্ভাবনাও বাড়ে, যা অসুস্থতার কারণে ছুটির হার বাড়াতে পারে।
তবে শুধু শারীরিক অসুস্থতাই বিষয়টির ব্যাখ্যা নয়। কাজকে নিজের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন—এমন মানুষ অনেক সময় অসুস্থ হলেও কাজ থেকে দূরে থাকতে চান না। তাদের কাছে একদিনের ছুটিও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে।

বিশেষ করে চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষকসহ মানুষের সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পেশাগুলোতে এমন প্রবণতা দেখা যেতে পারে। কারণ নিজের অনুপস্থিতির কারণে অন্যদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়বে—এই চিন্তা অনেককে কাজে যেতে উৎসাহিত করে।
অন্যের চোখে নিজের ভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকেন অনেকে। অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিলে সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতনরা তাকে অলস, দুর্বল কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেও কেউ কেউ অফিসে চলে যান। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মীদের মধ্যে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার ভয় বিশেষভাবে কাজ করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ। কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা কম থাকলে একজনের অনুপস্থিতিতেই অন্যদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন কর্মী নিজেই ছুটি নিতে অস্বস্তি বা অপরাধবোধে ভুগতে পারেন।
কর্মক্ষেত্রে যদি কর্মীদের সুস্থতার চেয়ে কাজের পরিমাণ ও উৎপাদনশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলেও অসুস্থ অবস্থায় কাজে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। কারণ কর্মীরা তখন মনে করতে পারেন, অসুস্থ হলেও কাজ চালিয়ে যাওয়াই প্রত্যাশিত আচরণ।

কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিও এই অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে। অসুস্থ শরীর নিয়েও অফিসে আসা কর্মী যদি প্রশংসা বা বিশেষ স্বীকৃতি পান, তাহলে অন্যরাও সেটিকে দায়িত্বশীলতার উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন। ধীরে ধীরে অসুস্থ অবস্থায় কাজ করাটাই যেন কর্মনিষ্ঠার স্বাভাবিক চিহ্ন হয়ে ওঠে।
তবে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সবসময় কর্মীর ব্যক্তিগত পছন্দের ফল নয়। চাকরির নিরাপত্তা, সহকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ, প্রতিষ্ঠানের নীতি, ঊর্ধ্বতনদের মনোভাব এবং কর্মক্ষেত্রের সামগ্রিক সংস্কৃতি—সবকিছুই এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই একজন কর্মী অসুস্থ হলে শুধু ‘ছুটি নিচ্ছেন না কেন’—এই প্রশ্নের বদলে তিনি যে পরিবেশে কাজ করছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সুস্থ কর্মপরিবেশে অসুস্থতার সময় প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজনে ছুটি নেওয়ার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।



