ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা নাগ

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো ছিল অনেকটাই পুরুষকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সীমিত, আর নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল প্রায় চোখে পড়ার মতো বিরল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত কাঠামো নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সামাজিক বাস্তবতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নানা দ্বিধার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নারীর উপস্থিতি তখনও ছিল ব্যতিক্রম। ঠিক এমন এক সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন লীলা নাগ।
কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন লীলা। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য আবেদন করেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর ভর্তি তখনও একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার পি. জে. হার্টগ তার আবেদন অনুমোদন করেন। এর মধ্য দিয়ে লীলা নাগ প্রবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একেবারে শুরুর অধ্যায়ে।

তবে সেই যাত্রায় তিনি একা ছিলেন না। একই সময়ে সুষমা সেনগুপ্তও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষাবর্ষে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র দুজন—লীলা নাগ ও সুষমা সেনগুপ্ত। লীলা ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং সুষমা অর্থনীতিতে পড়াশোনা শুরু করেন।
আজকের চোখে বিষয়টি হয়তো স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু এক শতাব্দী আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ এতটা সহজ ছিল না। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তখন আলাদা আবাসিক ব্যবস্থা তো ছিলই না, এমনকি প্রয়োজনীয় সাধারণ সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত ছিল না। লীলা নাগের ক্লাস করার ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা নারীদের জন্য নীতিগতভাবে খোলা থাকলেও সেই দরজা দিয়ে বাস্তবে প্রবেশ করতে প্রয়োজন হয়েছিল বাড়তি সাহস ও উদ্যোগের।
দুই বছরের অধ্যয়ন শেষে ১৯২৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন লীলা নাগ। এর মধ্য দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত এই একটি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
নিজের জন্য উচ্চশিক্ষার যে সুযোগ তিনি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেটিকেই তিনি আরও অনেক নারীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করেন। নারীশিক্ষাকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন লীলা নাগ। ঢাকায় মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তিনি কাজ করেন এবং একটি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষাকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং নারীর আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল। একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের পাশাপাশি নারী আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
তাই লীলা নাগের জীবনকে শুধু ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট’-এর গল্প হিসেবে দেখলে তার ভূমিকার একটি বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়। তার গল্পের প্রথম অধ্যায়ে আছে নিজের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে নেওয়ার সংগ্রাম। আর পরের অধ্যায়ে দেখা যায়, সেই দরজা দিয়ে তিনি যেন আরও অনেক নারীকে এগিয়ে আসার পথ দেখানোর চেষ্টা করছেন।
এক শতাব্দী পেরিয়ে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র অনেক বদলে গেছে। শ্রেণিকক্ষ থেকে গবেষণাগার, প্রশাসন থেকে বিভিন্ন নেতৃত্বের পর্যায়—সবখানেই নারীর উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। হাজারো নারী শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন, গবেষণা করছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন। অথচ এই স্বাভাবিক দৃশ্যের পেছনে রয়েছে এমন কিছু মানুষের পথচলা, যাদের সময়ের বাস্তবতায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল নতুন কিছু করার মতো।
লীলা নাগ ছিলেন তাদেরই একজন। তার সামনে যে পথটি তখনও পুরোপুরি তৈরি ছিল না, তিনি সেই পথেই প্রথম দিকের পদচিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন। তার অর্জনের মূল্য তাই শুধু একটি ডিগ্রিতে নয়; বরং সেই সাহসে, যার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—শিক্ষার অধিকার কেবল কাগজে স্বীকৃত হলেই হয় না, সেটিকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও কাউকে না কাউকে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হয়।
একজন নারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে লীলা নাগ যে পথচলা শুরু করেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা সেই পথকে আরও বিস্তৃত করেছেন। আজকের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক উপস্থিতির দিকে তাকালে তাই এক শতাব্দী আগের সেই ছোট্ট কিন্তু ঐতিহাসিক পদক্ষেপটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লীলা নাগের গল্প শেষ পর্যন্ত শুধু একজন নারীর সাফল্যের গল্প নয়—এটি একটি দরজা খোলার গল্প, যে দরজা দিয়ে পরে অসংখ্য নারী উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে গেছেন।



