ভালোবাসা আছে, কিন্তু আবেগের যোগাযোগ নেই- সমস্যা কোথায়?

সম্পর্কের শুরুটা অনেক সময় গল্পের মতো সুন্দর হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, ছোটখাটো বিষয়েও আগ্রহ—সব মিলিয়ে মনে হয়, দুজনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর এক বোঝাপড়া। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে যেতে পারে। তখন হয়তো সঙ্গী দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন, অথচ নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে গেলেই নীরব হয়ে যাচ্ছেন। সম্পর্কের কোনো জটিল বিষয় সামনে এলে এড়িয়ে যাচ্ছেন, কিংবা আপনার কষ্টের কথা শুনেও তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
এমন আচরণকে অনেক সময় বলা হয় ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল’—অর্থাৎ আবেগগতভাবে অনুপস্থিত থাকা। তবে শুধু কম কথা বলা বা আবেগ কম প্রকাশ করলেই কাউকে এমন তকমা দেওয়া ঠিক নয়। বিষয়টি বুঝতে হলে দেখতে হবে, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর আচরণে এমন কোনো নির্দিষ্ট ধরণ তৈরি হয়েছে কি না।
কথার মানুষ, অনুভূতির নয়
চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘কাউকে বিচার করার আগে বিষয়টি বোঝা জরুরি। কারণ, কম কথা বলা, নিজের ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা বা সব সময় আবেগ প্রকাশ না করা মানেই একজন মানুষ আবেগগতভাবে অনুপস্থিত—এমন নয়।’ তাঁর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্কের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ ও অংশগ্রহণ। একজন মানুষ যদি নিয়মিতভাবে আবেগের আলোচনা এড়িয়ে যান, সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে না চান কিংবা সঙ্গীর অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে সেটি খেয়াল করার মতো বিষয়।
কেউ হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে অনায়াসে আড্ডা দিতে পারেন, কাজ বা বিনোদনের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলতে পারেন। কিন্তু ‘কী নিয়ে চিন্তিত?’ কিংবা ‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তুমি কেমন অনুভব করছ?’—এ ধরনের প্রশ্ন উঠলেই অস্বস্তি প্রকাশ করতে পারেন। কেউ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে থেমে যান, কেউ প্রসঙ্গ বদলে ফেলেন, আবার কেউ হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এক-দুবার এমন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আবেগগত বিষয়গুলো নিয়ে যদি বারবার একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তাহলে সঙ্গীর মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সম্পর্ক গভীর হলেই দূরত্ব কেন?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সম্পর্কের শুরুতে আগ্রহ থাকে প্রবল। তাঁরা নিয়মিত যোগাযোগ করেন, সময় দেন, সঙ্গীর প্রতি যত্নশীল থাকেন। কিন্তু সম্পর্ক যখন আরও গভীর হতে শুরু করে, তখন আচরণে আসে পরিবর্তন। যোগাযোগ কমে যায়, ব্যস্ততার অজুহাত বাড়ে কিংবা আগের মতো আগ্রহ দেখা যায় না।
সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘অনেক সম্পর্কেই একটি অদ্ভুত চক্র দেখা যায়। শুরুতে একজন মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক থাকেন। নিয়মিত যোগাযোগ করেন, সময় দেন এবং আগ্রহ দেখান। কিন্তু সম্পর্কটি যখন আরও গভীর পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে, তখন তাঁর আচরণ বদলে যেতে পারে।’
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভয়, অতীতের কোনো মানসিক আঘাত কিংবা সম্পর্কের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকা—সবই ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো একটি কারণ ধরে নেওয়ার আগে দেখতে হবে, আচরণটি সাময়িক নাকি নিয়মিতভাবে ফিরে আসছে।
আপনার কষ্ট কি তাঁর কাছে ‘অতিরিক্ত’?
সম্পর্কে দুজন মানুষের অনুভূতি সব সময় এক হবে না। একই ঘটনা একজনকে যতটা কষ্ট দিতে পারে, অন্যজন হয়তো সেটিকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও করতে পারেন। কিন্তু মতের অমিল আর সঙ্গীর অনুভূতিকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।আপনি যদি বলেন, ‘তুমি কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলছ না। এতে আমার খারাপ লাগছে’, তাহলে সঙ্গী হয়তো বলতে পারেন, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার খারাপ লাগছে। আসলে কাজের চাপের কারণে ঠিকমতো সময় দিতে পারিনি।’
এখানে আপনার অনুভূতিকে স্বীকার করার চেষ্টা আছে। কিন্তু যদি প্রতিবার আপনার কষ্টকে ‘নাটক’, ‘অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা’ কিংবা ‘অযথা সমস্যা তৈরি’ হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতেই ভয় তৈরি হতে পারে। একসময় মনে হতে পারে, কষ্ট পাওয়াটাই বুঝি ভুল। আর সেখান থেকেই সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে গভীর একাকিত্ব।
আবেগের ভার কি শুধু আপনার?
সম্পর্কে একজন মানুষ কখনো বেশি কথা বলবেন, কখনো অন্যজন। একজন হয়তো কোনো কঠিন সময়ে বেশি সমর্থন চাইবেন, অন্যজন অন্য সময়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান আবেগগত বিনিয়োগ আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে একদিকে ঝুঁকে থাকে।
আপনি তাঁর ভয়, দুশ্চিন্তা, স্বপ্ন কিংবা কষ্ট শুনছেন। তাঁর কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অথচ আপনার নিজের অনুভূতির জায়গায় বারবার বন্ধ দরজা। এমন সম্পর্কে বাইরে থেকে দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেলেও ভেতরে একজন মানুষ নিজেকে একাই মনে করতে পারেন। দীর্ঘ সময় ধরে যদি সব সময় একজনই অন্যজনকে সামলান, তাহলে সম্পর্কটি ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।’
তাহলে কী করবেন?
প্রথম কাজ হলো নিজের অনুভূতিকে ছোট না করা। বারবার একা, অবহেলিত বা অনিশ্চিত বোধ করলে সেই অনুভূতি চেপে রাখার পরিবর্তে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা দরকার। তবে অভিযোগের ভাষায় না গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলা বেশি কার্যকর হতে পারে।
এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া দেখা। তিনি কি আপনার কথা মন দিয়ে শুনছেন? নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন? সমস্যাটি বুঝতে চাইছেন? নাকি প্রতিবার আপনার অনুভূতিকে অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন?
কারণ, মানুষের নিজের সমস্যা বা আবেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। সেটি নিজে থেকে সম্পর্কের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো—সেই সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারার পর তিনি কি সম্পর্কের জন্য কাজ করতে আগ্রহী?
ভালোবাসার পাশাপাশি নিরাপত্তাও জরুরি
কেউ আপনার সঙ্গে অনেক সময় কাটাতে পারেন, নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারেন, কিন্তু তবু তাঁর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে আপনি নিরাপদ বোধ নাও করতে পারেন। আবার কেউ খুব বেশি কথা না বলেও আপনার মন খারাপ বুঝতে পারেন, মন দিয়ে শুনতে পারেন এবং আপনার অনুভূতিকে ছোট না করে পাশে দাঁড়াতে পারেন। তাই সম্পর্ক বিচার করার সময় শুধু ‘সে আমাকে ভালোবাসে কি না’—এই প্রশ্নে আটকে থাকা যথেষ্ট নয়। বরং নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার—‘আমি কি এই মানুষটির কাছে নিজের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি?’
একটি গভীর সম্পর্ক শুধু আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জায়গা নয়। সেখানে ভয়, দুর্বলতা, হতাশা এবং কষ্ট নিয়েও কথা বলার সুযোগ থাকে। সঙ্গী সব সময় আপনার অনুভূতির সঙ্গে একমত হবেন না, কিন্তু আপনার অনুভূতিকে সম্মান করার চেষ্টা থাকা জরুরি।
আর যদি দীর্ঘদিন ধরে মনে হয়, মানুষটি পাশে থেকেও আবেগের জায়গায় অনেক দূরে, তাহলে সেই অনুভূতিকে উপেক্ষা না করে সম্পর্কের যোগাযোগের ধরনটি নতুন করে দেখা দরকার।



