১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

ব্রেকআপের পর কি নারীরাই বেশি কষ্ট পান?

IMG-20260916-WA0021

ব্রেকআপের পর কি নারীরাই বেশি কষ্ট পান?

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর কেউ কাঁদেন, কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেন, আবার কেউ স্বাভাবিক থাকার ভান করে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাইরে থেকে দুজন মানুষের প্রতিক্রিয়া একেবারে আলাদা মনে হলেও ভেতরের কষ্টটা অনেক সময়ই সহজে বোঝা যায় না। দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে শুধু একজন মানুষকে হারানোর অনুভূতিই তৈরি হয় না; বদলে যায় দৈনন্দিন অভ্যাস, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা, সামাজিক পরিচয় এবং নিজের সম্পর্কে ধারণাও।

তবে প্রচলিত একটি ধারণা হলো—ব্রেকআপের পর নারীরাই নাকি বেশি কষ্ট পান। সত্যিই কি তাই?

প্রথম ধাক্কাটা বেশি অনুভব করেন নারীরা?

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর নারীরা অনেক সময় দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে আবেগ প্রকাশ করেন। কান্না, কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, পুরোনো ছবি দেখা কিংবা নিজের অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করা—এসব আচরণে কষ্টটা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায়।

অন্যদিকে অনেক পুরুষ বিচ্ছেদের পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করে কাজে ডুবে থাকা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে পারেন। ফলে মনে হতে পারে, তিনি হয়তো তেমন কষ্টই পাননি। কিন্তু আবেগ প্রকাশের ধরন আর আবেগের তীব্রতা এক বিষয় নয়। কেউ কাঁদছেন বলে তাঁর কষ্ট বেশি, আর কেউ চুপ আছেন বলে তাঁর কষ্ট কম—এমন সমীকরণ করা যায় না।

Advertisements

কেন নারীদের কষ্টটা বেশি দৃশ্যমান হতে পারে?

সামাজিকভাবে নারীদের আবেগ প্রকাশের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁরা বন্ধু, পরিবার বা কাছের মানুষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় কষ্ট প্রকাশ পায় এবং ধীরে ধীরে তা সামলানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অনেক পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা বা দুর্বলতা প্রকাশ না করার শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে বিচ্ছেদের পর তাঁদের কষ্ট অনেক সময় প্রকাশ্যে আসে না। কেউ হয়তো একেবারে স্বাভাবিকভাবে অফিস করছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন; অথচ একা হলে সম্পর্কটির কথা মনে পড়ে গভীর শূন্যতা অনুভব করতে পারেন। অর্থাৎ, দৃশ্যমান কষ্টকে মোট কষ্টের পরিমাণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সম্পর্কের বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ

ব্রেকআপের পর কে বেশি কষ্ট পাবেন, তা শুধু নারী না পুরুষ—এই পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। সম্পর্কটিতে কে কতটা আবেগ, সময়, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিনিয়োগ করেছিলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি সম্পর্কটিকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছেন, বিচ্ছেদের পর তাঁর শূন্যতাও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যদি সম্পর্কটি দীর্ঘদিনের হয়, একসঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকে কিংবা হঠাৎ করে বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে মানিয়ে নিতে সময় লাগা স্বাভাবিক।

বিচ্ছেদের পর নারীরা কি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ান?

এখানেও বিষয়টি কিছুটা জটিল। বিচ্ছেদের পর নারীরা অনেক সময় প্রথম দিকে বেশি মানসিক কষ্ট অনুভব করলেও বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সামাজিক সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগ পান।

অন্যদিকে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা সম্পর্ক ভাঙার পর দীর্ঘমেয়াদে একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যায় বেশি ভুগতে পারেন। বিশেষ করে যদি তাঁদের ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগের পরিধি সীমিত হয়, তাহলে সাবেক সঙ্গীকে হারানোর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই ‘কে বেশি কষ্ট পেলেন’—এর চেয়ে ‘কে কীভাবে কষ্ট সামলাচ্ছেন’—এই প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কষ্টের ধরনও এক নয়

ব্রেকআপের পর নারীর কষ্ট অনেক সময় আবেগ, স্মৃতি ও সম্পর্কের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ভাবার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। বারবার মনে হতে পারে—কোথায় ভুল হয়েছিল, আরেকটু চেষ্টা করলে সম্পর্কটি টিকত কি না, কিংবা প্রাক্তন মানুষটি এখন কেমন আছেন। পুরুষের ক্ষেত্রে কষ্ট কখনো প্রকাশ পেতে পারে রাগ, অতিরিক্ত ব্যস্ততা, সামাজিকভাবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া কিংবা নতুন সম্পর্কে দ্রুত জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে। তবে এগুলোর কোনোটিই নারী বা পুরুষের জন্য সার্বজনীন নিয়ম নয়। ব্যক্তি, সম্পর্ক এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া বদলে যায়।

‘ভুলে যাওয়া’ আর ‘সেরে ওঠা’ এক নয়

ব্রেকআপের পর অনেকেই দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বা নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখেন। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, মানুষটি খুব সহজেই সবকিছু ভুলে গেছেন। কিন্তু নতুন সম্পর্কে যাওয়া বা ব্যস্ত থাকা মানেই আগের সম্পর্কের আবেগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন নয়। আবার কেউ দীর্ঘদিন একা থেকে পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে ভাবলেও তার অর্থ এই নয় যে তিনি এগিয়ে যেতে পারছেন না। মানসিকভাবে সেরে ওঠার গতি প্রত্যেক মানুষের আলাদা।

তাহলে নারীরাই কি বেশি কষ্ট পান?

সরলভাবে বললে, এমন কোনো নিয়ম নেই যে ব্রেকআপের পর নারীরা পুরুষের তুলনায় সবসময় বেশি কষ্ট পান। কিছু গবেষণায় বিচ্ছেদের পর নারীদের প্রাথমিক মানসিক প্রতিক্রিয়া বেশি তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, আবার দীর্ঘমেয়াদি মানিয়ে নেওয়া ও একাকিত্বের ক্ষেত্রে পুরুষদেরও উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, কষ্টের মাত্রা নির্ধারণ করে লিঙ্গ নয়—সম্পর্কের গভীরতা, বিচ্ছেদের ধরন, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সহায়তা, পারিবারিক পরিবেশ এবং আগের মানসিক অভিজ্ঞতা।

তাই ব্রেকআপের পর কেউ বেশি কাঁদছেন আর কেউ চুপচাপ আছেন—এ দেখে কার কষ্ট বেশি, তা মাপা সম্ভব নয়। হৃদয় ভাঙার কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই। কেউ তা চোখের জলে প্রকাশ করেন, কেউ নীরবতায়, আবার কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ফিরতে নিজের ভেতরেই দীর্ঘ একটা সময় ধরে তা সামলে নেন।

Advertisements