কেন বাংলা বাঁ থেকে ডানে, আরবি ডান থেকে বাঁয়ে লেখা হয়

বাংলা বা ইংরেজি লিখতে আমাদের কলম চলে বাঁ দিক থেকে ডানে। আবার আরবি, ফারসি কিংবা হিব্রু ভাষা লেখা হয় ডান দিক থেকে বাঁয়ে। ভাষাভেদে লেখার এই ভিন্ন দিকের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস এবং প্রাচীন লেখার উপকরণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা কারণ।
প্রাচীন যুগে কাগজ-কলমের প্রচলন ছিল না। মানুষ পাথরের ওপর হাতুড়ি ও ছেনি দিয়ে লেখার কাজ করত। মধ্যপ্রাচ্যের আরবি, ফারসি ও হিব্রুর মতো লিপিগুলোর পূর্বসূরি অনেক প্রাচীন লিপি পাথরে খোদাই করা হতো।
বেশির ভাগ মানুষ ডানহাতি হওয়ায় একজন ডানহাতি কারিগর সাধারণত বাঁ হাতে ছেনি এবং ডান হাতে হাতুড়ি ধরতেন। এভাবে কাজ করার সময় ডান দিক থেকে বাঁ দিকে এগিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক ছিল। বাঁ দিক থেকে খোদাই শুরু করলে কারিগরের বাঁ হাত দৃষ্টির পথে আসতে পারত। হাতুড়ির আঘাত ভুলভাবে হাতে লাগার ঝুঁকিও ছিল। ফলে ডান থেকে বাঁয়ে লেখার রীতি অনেক প্রাচীন লিপিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন প্যাপিরাস, চামড়া, পাতা ও অন্যান্য লেখার উপকরণ ব্যবহার করতে শুরু করল, তখন কালি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডানহাতি কেউ ডান থেকে বাঁয়ে লিখলে সদ্য লেখা অংশের ওপর হাত ঘষে কালি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকত। বিপরীতে বাঁ থেকে ডানে লিখলে হাত লেখার সামনের ফাঁকা অংশে থাকে। এতে কালি লেপটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং লেখা তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে।
এই কারণগুলোর সঙ্গে লেখার উপকরণ ও প্রচলিত রীতির পরিবর্তন মিলেই বিভিন্ন ভাষার লেখার দিক আলাদা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যেও একসময় ভিন্ন পদ্ধতি দেখা যেত। তারা এক লাইন বাঁ থেকে ডানে এবং পরের লাইন ডান থেকে বাঁয়ে লিখত। মাঠে ষাঁড়ের হালচাষের মতো এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘বউস্ট্রোফেডন’। পরে গ্রিকরা বাঁ থেকে ডানে লেখার রীতিই গ্রহণ করে।
অন্যদিকে চীনা ও জাপানি লেখার ঐতিহ্যে ওপর থেকে নিচে লেখার রীতিও দেখা যায়। বাঁশের কঞ্চি ও তুলির মতো উপকরণ ব্যবহার করে লেখার সঙ্গে এই উল্লম্ব বিন্যাসের সম্পর্ক ছিল।
অর্থাৎ বাংলা বাঁ থেকে ডানে কিংবা আরবি ডান থেকে বাঁয়ে লেখা কোনো ইচ্ছামতো নির্ধারিত নিয়ম নয়। প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত উপকরণ, লেখার কৌশল এবং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যই বিভিন্ন ভাষার লেখার দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।



