হারিকেন ও কুপির আলোয় জমেছে পুঁথি পাঠের আসর

শরতের আকাশ জুড়ে পূর্ণিমার চাঁদ। গ্রামের বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন নানা বয়সী মানুষ। আর তাদের সামনে জলচৌকিতে বসেছেন পুঁথির পাঠক। হারিকেন আর কুপির মৃদু আলোয় তৈরি হয়েছে মায়াময় পরিবেশ। চারপাশে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে ভেসে আসছে পুঁথি পাঠের সুর।

কয়েক দশক আগে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসা এমন দৃশ্যের দেখা মিলল পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে বসেছিল লোকজ ঐতিহ্যের পুঁথি পাঠের আসর। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নিস্তব্ধ গ্রামীণ পরিবেশে যেন ফিরে এসেছিল আশি-নব্বইয়ের দশকের কোনো এক রাত।
চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে চলনবিলের পাড়ে সোনাহারপাড়া গ্রাম। চাটমোহর জারদিস মোড় থেকে মান্নানগর পর্যন্ত ভাঙাচোরা ও ধুলোময় সড়ক পেরিয়ে গ্রামে ঢোকার পথে ইট বিছানো রাস্তা। সেই পথ ধরে রাত সাড়ে আটটার দিকে পুঁথি পাঠের আসরে পৌঁছানো যায়।

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা। অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও একে একে সেখানে জড়ো হতে থাকেন গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা। মাথার ওপর পূর্ণিমার চাঁদ। উঠোনে জ্বলছে কুপি ও হারিকেন। সময় যত গড়ায়, দর্শকের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে উঠোন ভরে যায় মানুষে। শুধু চাটমোহর নয়, ঢাকা থেকেও কয়েকজন সংস্কৃতিপ্রেমী ছুটে আসেন এই আয়োজন দেখতে।
রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শুরু হয় পুঁথি পাঠ। বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় প্রথমে আসরের মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক চিকিৎসক আতিকুর রহমান আতিক। এরপর শুরু হয় মূল আয়োজন।
‘বিবি সোনাভান’ পুঁথি পাঠ করেন নব্বইয়ের দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ পুঁথি পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। তাদের পুঁথি পাঠের সুরে মুগ্ধ হয়ে থাকেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। পরে দুই পাঠকের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
পুঁথির গায়েনের কণ্ঠে মায়াবি সুর। পূর্ণিমার আলো আর কুপির হলদে আলোয় সেই সুর যেন আরও আবেশ তৈরি করে। যারা ছোটবেলায় দাদা-দাদির মুখে পুঁথির গল্প শুনেছেন, তাদের অনেকেই ফিরে যান সেই স্মৃতির ভেতর। আর তরুণদের অনেকে প্রথমবারের মতো কাছ থেকে দেখেন গ্রামবাংলার এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।
পুঁথি পাঠ শুনতে আসা সত্তরোর্ধ্ব কৃষক হাসান প্রামাণিক বলেন, ‘৪০ বছর আগে পুঁথি পাঠ শুনেছিলাম। তখন মুরুব্বিরা আয়োজন করতেন। আমরা কৃষিকাজ করতাম। অবসরে এসে আসরে বসে পুঁথি পাঠ শুনতাম। এত বছর পর আবার আয়োজনটা দেখে ভালো লাগছে।’
ছেলেকে নিয়ে আসা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, ‘ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় নানাবাড়ির বৈঠকখানায় এ রকম পুঁথি পাঠের আসর বসত। এত বছর পর পুঁথি পাঠ দেখে-শুনে মনে হলো, আবার সেই ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছি। এখন তো আমরা মোবাইলে ডুবে আছি। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখা দরকার।’
ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘আসলে পুঁথি পাঠ কী, তা জানতাম না। ফেসবুকে আয়োজনের প্রস্তুতির খবর দেখে ডা. আতিককে ফোন করে জানতে পারি। আগে কখনো পুঁথি পাঠ দেখিনি। তাই আব্বুর সঙ্গে দেখতে এসে খুব ভালো লাগল।’
চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন, ‘যখন সারা পৃথিবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে ডুবে আছে, তখন এ ধরনের পুঁথি পাঠের আয়োজন বিরল ঘটনা। শত শত বছরের ঐতিহ্য আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। পুঁথি পাঠ আমাদের আদি সংস্কৃতির একটি অংশ। এটি ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’
প্রথমবার পুঁথি পাঠ করতে পেরে আবেগাপ্লুত নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। তিনি বলেন, ‘আগে যখন গ্রামে পুঁথি পাঠ শুনতাম, তখন থেকেই এর সুরটা আমার মধ্যে ছিল। আমি পুঁথির পাঠক নই, তারপরও আজ প্রথম পাঠ করলাম। মনে হলো, মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরি করতে এবং মানুষকে পাশাপাশি আনতে পুঁথি পাঠের মতো গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখা প্রয়োজন। এখনকার গল্প দিয়ে পুঁথি বাঁধা হলে মানুষকে সুন্দর পথের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব।’

আয়োজক চিকিৎসক আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে। তার অন্যতম পুঁথি পাঠ। ষোলো-সতেরো শতক থেকে আশি-নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত কোনোভাবে এটি টিকে ছিল। বর্তমানে এই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। অনেকে জানেনই না পুঁথি পাঠ কী। আমরা সেই সময়টায় ফিরে যেতে চেয়েছি, দেখতে চেয়েছি তখনকার পুঁথি পাঠের আসর কেমন ছিল। মূলত হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই আয়োজন।’
এই আয়োজনের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে সোনাহারপাড়ায় ছুটে আসেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো একটি আয়োজন। নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে পুঁথি পাঠকে জনপ্রিয় করে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হলে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন গল্প তৈরি করতে হবে। এতে মানুষের শোনার আগ্রহ বাড়বে। এভাবে পুঁথি পাঠের ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে শেষ হয় পুঁথি পাঠের আসর। তবে পূর্ণিমার আলোয় গ্রামের সেই উঠোনে তখনো যেন রয়ে যায় পুরোনো দিনের আবেশ।
সূত্র: সমকাল



