১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

শরীর ছুটিতে, মন অফিসে—কেন এমন হয়?

image

ছুটি মানেই কাজ থেকে বিরতি। অফিসের ব্যস্ততা, মিটিং, ই-মেইল আর একের পর এক দায়িত্ব থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে থাকা। কিন্তু বাস্তবে অনেকের ক্ষেত্রেই শরীর অফিস থেকে দূরে গেলেও মন ঠিকই পড়ে থাকে কর্মক্ষেত্রে।

পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ মনে হতে পারে—‘অফিসের ওই কাজটা কি শেষ হয়েছে?’ সমুদ্রের ধারে বসে মনে হতে পারে, ‘কেউ কি ই-মেইলের উত্তর দিয়েছে?’ আবার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মাঝেও অনেকে অজান্তেই ফোন হাতে নিয়ে অফিসের মেসেজ বা গ্রুপ চেক করেন।

একবার দেখতে গিয়ে কখন যে ১০-১৫ মিনিট কেটে যায়, সেটিও অনেক সময় বোঝা যায় না।

কিন্তু এমনটা কেন হয়? এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের কাজের ধরন, দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অসমাপ্ত কাজের চাপ এবং কর্মজীবনের সঙ্গে তৈরি হওয়া মানসিক সংযোগ।

অসমাপ্ত কাজ মাথা থেকে সরতে চায় না

ছুটিতে অফিসের কথা মনে পড়ার অন্যতম কারণ হলো অসমাপ্ত কাজ। মনোবিজ্ঞানে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে জেইগারনিক ইফেক্ট-এর কথা বলা হয়।

১৯২৭ সালে সোভিয়েত মনোবিজ্ঞানী ব্লুমা জেইগারনিক লক্ষ্য করেন, মানুষ সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া কাজের তুলনায় অসমাপ্ত কাজ বেশি মনে রাখে। অর্থাৎ কোনো দায়িত্ব শেষ না করে ছুটিতে গেলে মস্তিষ্ক সেটিকে পুরোপুরি ‘বন্ধ’ করতে পারে না।

Advertisements

ফলে আপনি যতই অন্য কোনো কাজে মন দিতে চান, মাঝেমধ্যে সেই অসমাপ্ত কাজটির কথা মনে পড়ে যেতে পারে। মনে হতে পারে—কাজটি কে করবে, কোনো ভুল হয়েছে কি না, ফিরে গিয়ে কীভাবে শেষ করবেন ইত্যাদি।

সহজভাবে বললে, অসমাপ্ত কাজ মস্তিষ্কে একটি ‘খোলা ফাইল’-এর মতো পড়ে থাকে।

দীর্ঘদিনের অভ্যাসও বড় কারণ

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, ই-মেইল দেখা, মিটিং করা, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা—এসব আচরণ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মস্তিষ্ক এগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

তাই হঠাৎ কয়েক দিনের ছুটি নিলেই সেই অভ্যাস একদিনে বদলে যায় না।

বিশেষ করে যারা অফিসের ই-মেইল, মেসেজ বা নোটিফিকেশন নিয়মিত পরীক্ষা করেন, তাদের ক্ষেত্রে ফোন দেখার অভ্যাসটি অনেকটা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ছুটিতেও অকারণে ফোন হাতে নেওয়া এবং অফিসের কোনো আপডেট এসেছে কি না দেখা সেই অভ্যাসেরই প্রকাশ।

ফোন যেন অফিসকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরায়

আগে অফিস থেকে ছুটি নেওয়ার অর্থ ছিল কর্মক্ষেত্র থেকে বাস্তবিক অর্থেই দূরে থাকা। এখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কারণে সেই দূরত্ব অনেকটাই কমে গেছে।

অফিসের একটি মেসেজ, ই-মেইল কিংবা ফোনকল মুহূর্তের মধ্যে আপনাকে আবার কাজের জগতে ফিরিয়ে দিতে পারে।

এ কারণেই ছুটিতে থেকেও নিয়মিত অফিসের যোগাযোগ পরীক্ষা করলে মস্তিষ্কের জন্য কাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, অবসর সময়ে কাজের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানসিকভাবে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে থাকার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

‘ফ্যান্টম নোটিফিকেশন’-এর প্রভাব

অনেকের এমনও হয়, ফোনে কোনো নোটিফিকেশন না এলেও মনে হয় ফোন বেজেছে বা মেসেজ এসেছে। এটিকে সাধারণভাবে ‘ফ্যান্টম নোটিফিকেশন’ বা ‘ফ্যান্টম ভাইব্রেশন’ বলা হয়।

দিনের পর দিন ঘন ঘন ফোন চেক করার অভ্যাস মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যে, ছুটির সময়ও ফোনের প্রতি অপ্রয়োজনীয় মনোযোগ তৈরি হয়।

ফলে চারপাশে প্রকৃতির সৌন্দর্য থাকলেও মন পড়ে থাকতে পারে স্ক্রিনে—‘অফিস থেকে নতুন কোনো মেসেজ এলো কি না?’

‘আমি না থাকলে কী হবে?’—এই ভাবনাও কাজ করে

অফিসের চিন্তা শুধু কাজের চাপ থেকেই আসে না। নিজের দায়িত্বের প্রতি অতিরিক্ত সচেতনতা থেকেও এমনটা হতে পারে।

কিছু মানুষ তাদের পেশা ও কর্মক্ষেত্রকে নিজের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন, নিজের অনুপস্থিতিতে হয়তো কাজ আটকে যাবে বা কোনো সমস্যা তৈরি হবে।

দায়িত্বশীলতার এই মানসিকতা অবশ্যই ইতিবাচক হতে পারে। তবে সেটি যদি এমন পর্যায়ে যায় যে ছুটির সময়ও কাজের চিন্তা থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না, তখন বিশ্রামের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

ছুটিতে অফিসের কথা মনে পড়া কি সবসময় খারাপ?

না। ছুটির মধ্যে একবার-দুবার কাজের কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। কোনো নতুন ধারণা মাথায় আসা কিংবা কোনো কাজ কীভাবে আরও ভালো করা যায় তা ভাবাও সবসময় ক্ষতিকর নয়।

২০২০ সালে প্রকাশিত দুটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা যায়, কাজ নিয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করা এবং কাজ থেকে মানসিকভাবে দূরে থাকা—দুই ধরনের কৌশলই মানুষের নেতিবাচক আবেগ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সমস্যা তখনই, যখন কাজের চিন্তা আপনার অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নেয়।

ধরুন, আপনি পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গেছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে বারবার অফিসের মেইল দেখছেন, আগামী সপ্তাহের মিটিং নিয়ে ভাবছেন, অসমাপ্ত কাজের হিসাব করছেন এবং অফিসে ফিরে কী করবেন তা নিয়ে চিন্তা করছেন। এমন হলে বোঝা যায়, শারীরিকভাবে ছুটিতে থাকলেও মানসিকভাবে আপনি এখনো কর্মক্ষেত্রেই আছেন।

মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া কেন জরুরি?

ছুটি শুধু অফিসে অনুপস্থিত থাকার বিষয় নয়। বিশ্রামের জন্য কাজের চিন্তা থেকেও কিছুটা দূরে থাকা প্রয়োজন।

২০১৬ সালে ৭৭৭ জন মার্কিন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা ছুটির সময় কাজ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে পেরেছেন, বিশ্রাম অনুভব করেছেন এবং নিজেদের সময় ও কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে মনে করেছেন, তাদের ছুটির অভিজ্ঞতা ও সামগ্রিক জীবনসন্তুষ্টি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

আরেকটি ২০১৬ সালের বিশ্লেষণে ৩৮ হাজারের বেশি কর্মীর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে কাজ থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে কম ক্লান্তি, ভালো ঘুম, বেশি জীবনসন্তুষ্টি এবং উন্নত মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্ককেও কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া জরুরি।

ছুটিতে অফিসের চিন্তা কমাবেন যেভাবে

ছুটিতে গিয়ে অফিসের চিন্তা পুরোপুরি বন্ধ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কিছু প্রস্তুতি নিলে এটি অনেকটাই কমানো যায়।

১. যাওয়ার আগে অসমাপ্ত কাজ গুছিয়ে নিন
ছুটির আগে কোন কাজগুলো অবশ্যই শেষ করতে হবে এবং কোনগুলো পরে করা যাবে—তা আলাদা করে নিন।

২. দায়িত্ব ভাগ করে দিন
আপনার অনুপস্থিতিতে জরুরি কাজ কে সামলাবেন, তা আগে থেকেই সহকর্মীদের জানিয়ে দিন। এতে ‘আমি না থাকলে কী হবে?’ ধরনের দুশ্চিন্তা কমে।

৩. জরুরি যোগাযোগের সীমা নির্ধারণ করুন
কোন ধরনের পরিস্থিতিতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, আর কোন বিষয় ছুটির পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে—এটি পরিষ্কার করে দিন।

৪. অফিসের নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করুন
ছুটির পুরো সময় ফোন বন্ধ রাখা সম্ভব না হলে অন্তত অফিসের ই-মেইল ও মেসেজের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন।

৫. নির্দিষ্ট সময় ছাড়া অফিস চেক করবেন না
একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকা কঠিন মনে হলে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ছোট সময় অফিসের জরুরি আপডেট দেখার জন্য রাখতে পারেন। এতে সারাক্ষণ ফোন পরীক্ষা করার অভ্যাস কমবে।

৬. অন্য কাজে মন দিন
ভ্রমণ, বই পড়া, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতি দেখা কিংবা পর্যাপ্ত ঘুম—যে কাজগুলো আপনাকে আনন্দ দেয়, সেগুলোতে মনোযোগ দিন।

৭. নিজেকে মনে করিয়ে দিন—সব কাজ এখনই করতে হবে না
ছুটি মানে কিছু দায়িত্ব সাময়িকভাবে পিছিয়ে রাখা। সব সমস্যার সমাধান ছুটির মধ্যেই করতে হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাও গুরুত্বপূর্ণ।

ছুটির আসল উদ্দেশ্য ভুলে যাবেন না

ছুটিতে থেকেও যদি সারাক্ষণ অফিসের কথা ভাবতে হয়, তাহলে বিশ্রামের বড় একটি অংশই নষ্ট হয়ে যায়। তাই অফিসের কাজ নিয়ে সাময়িকভাবে চিন্তা আসতেই পারে—এ নিয়ে অপরাধবোধ করার প্রয়োজন নেই।

বরং যখন কাজের চিন্তা মাথায় আসে, নিজেকে মনে করিয়ে দিতে পারেন—কাজটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মুহূর্তে আপনার দায়িত্ব হলো বিশ্রাম নেওয়া।

অফিস আপনার অনুপস্থিতিতে কিছু সময় চলতেই পারে। কিন্তু আপনার মস্তিষ্ককে যদি সবসময় অফিসের কাজেই ব্যস্ত রাখতে হয়, তাহলে ছুটির সুযোগটাই অপূর্ণ থেকে যাবে।

তাই ছুটিতে গেলে কিছু সময়ের জন্য ফোনটা পাশে রাখুন, অফিসের নোটিফিকেশন থেকে দূরে থাকুন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটান কিংবা শুধু চুপচাপ বসে থাকুন।

Advertisements