১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

এমআরটি-৫ দক্ষিণ: গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যাবে মেট্রোরেল

image-300056-1776525919

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি মেট্রোরেল। মেট্রো রেল ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন এ প্রকল্পটি সভায় তুলবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তের গাবতলী থেকে পূর্বাঞ্চলের দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। এতে যাত্রীদের সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মানুষ এই মেট্রোরেল ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে।

প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের চাপও কমবে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন সড়কে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪৯টি কমতে পারে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমার ফলে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের জুনে যাত্রীদের জন্য মেট্রোরেলটি চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পুরো প্রকল্পের মেয়াদ রাখা হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। নতুন এই রুটটি এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাঞ্চলীয় অংশ এবং ভবিষ্যতের মেট্রো লাইন-২-এর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন অংশকে একটি সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।

গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রস্তাবিত রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ। পুরো রুটে স্টেশন থাকবে ১৫টি। এর মধ্যে ১১টি পাতাল স্টেশন এবং চারটি উড়াল স্টেশন।

রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে এগিয়ে যাবে। এরপর আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাছিরাবাদ পেরিয়ে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে।

Advertisements

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হিসেবে প্রাথমিক প্রাক্কলন থেকে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। শুরুতে এর সম্ভাব্য ব্যয় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে পাওয়া যাবে ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় করা হবে।

বিদেশি অর্থায়নের বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা ও ঋণচুক্তির কাজ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এডিবির সঙ্গে এ প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আগে থেকেই কাঠামোগত চুক্তি ছিল এবং পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে।

গাবতলী থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এই মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। ২০২২ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়। সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজে এরই মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও তৎকালীন সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া থেমে যায়।

পরবর্তীতে ব্যয় কমিয়ে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় পর্যায় থেকে অনুমোদন না পাওয়ায় তা আর সভায় তোলা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী হওয়ায় আবারও অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান মনে করেন, প্রকল্পটি নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্যান্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এখানে যাত্রী চাহিদা কিছুটা কম হতে পারে। তার মতে, প্রতিটি স্টেশনের সঙ্গে অন্যান্য গণপরিবহনের কার্যকর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে মেট্রোরেলটি আরও বেশি মানুষের কাজে আসবে। পাশাপাশি রুটের বড় অংশ পাতাল হওয়ায় নির্মাণ ও পরবর্তী পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দিকে এগোতে চাইছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং যানজট কমানোর ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকার যানজট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজধানীতে মোট পাঁচটি মেট্রোরেল লাইন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। নতুন লাইনগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মধ্যে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের পাশাপাশি একটি বিস্তৃত গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।

Advertisements