১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

আক্কেল দাঁত কেন ওঠে, আর উঠলেই এত ব্যথা হয় কেন?

images (9)

মানুষের মুখের সবচেয়ে পেছনের দিকে, ওপর ও নিচের চোয়ালের শেষ প্রান্তে যে দাঁতটি সবার শেষে গজায়, সেটিই পরিচিত ‘আক্কেল দাঁত’ নামে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘থার্ড মোলার’ বা তৃতীয় পেষণ দাঁত। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়, অর্থাৎ ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে এটি ওঠে। এই বয়সে মানুষের বুদ্ধি ও বিচারবোধ পরিণত হতে শুরু করে বলেই দাঁতটির এমন নামকরণ হয়েছে।

সবার ক্ষেত্রে আক্কেল দাঁত একইভাবে ওঠে না। কারও ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিকভাবে মাড়ি ভেদ করে বের হয়ে কোনো সমস্যাই তৈরি করে না। আবার কারও ক্ষেত্রে দাঁতটি বাঁকা হয়ে আটকে যায় এবং তখন শুরু হয় ব্যথা, মাড়ি ফুলে যাওয়া কিংবা নানা ধরনের সংক্রমণ।

আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন ও যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যেই আক্কেল দাঁত ওঠে। তবে কারও ক্ষেত্রে এর আগেও বা পরেও এটি দেখা দিতে পারে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওপর ও নিচের চোয়ালের দুই পাশে মোট চারটি আক্কেল দাঁত থাকার সম্ভাবনা থাকলেও সবার চারটি দাঁত ওঠে না। অনেকের ক্ষেত্রে একটি, দুটি বা একাধিক আক্কেল দাঁত জন্মগতভাবেই অনুপস্থিত থাকতে পারে।

আক্কেল দাঁত নিয়ে এত সমস্যা হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আধুনিক মানুষের চোয়ালে জায়গার সংকট। মানুষের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাস ছিল তুলনামূলকভাবে শক্ত খাবারনির্ভর। শক্ত ফল, বীজ কিংবা কাঁচা মাংস চিবানোর জন্য অতিরিক্ত মোলার দাঁত প্রয়োজন হতো। সময়ের সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। রান্না করা ও অপেক্ষাকৃত নরম খাবারের প্রচলন বেড়েছে। একই সঙ্গে বিবর্তনের কারণে মানুষের চোয়ালও আগের তুলনায় ছোট হয়েছে।

ফলে বর্তমানে অনেকের চোয়ালে আক্কেল দাঁত ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। তখন দাঁতটি সোজা হয়ে না উঠে পাশের দাঁতের দিকে বাঁকা হয়ে যেতে পারে কিংবা মাড়ি ও হাড়ের ভেতরেই আটকে থাকতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ইমপ্যাক্টেড টুথ’ বলা হয়।

আংশিকভাবে বের হওয়া আক্কেল দাঁতের চারপাশে খাবারের কণা সহজেই আটকে যায়। সেই জায়গায় ব্যাকটেরিয়া জমে গেলে মাড়িতে সংক্রমণ ও প্রদাহ হতে পারে। এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় ‘পেরিকোরোনাইটিস’। তখন মাড়িতে প্রচণ্ড ব্যথা, ফোলা এবং মুখে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে মুখ খুলতে কিংবা খাবার গিলতেও সমস্যা হয়।

Advertisements

সমস্যা শুধু মাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আক্রান্ত দাঁতে ক্যাভিটি হওয়ার পাশাপাশি পাশের সুস্থ দাঁতেও ক্ষয় দেখা দিতে পারে। কখনো দাঁতের গোড়ায় পুঁজ বা সিস্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই আক্কেল দাঁতের ব্যথাকে সবসময় সাধারণ দাঁতের ব্যথা ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।

দন্ত চিকিৎসক ডা. এ কে এম হাসানুজজামান জানান, চোয়ালের গঠন স্বাভাবিক হলে এবং দাঁত ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে আক্কেল দাঁত কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই উঠতে পারে। তবে দাঁত আটকে গেলে বা ভুল অবস্থানে বেড়ে উঠলে ব্যথার পাশাপাশি মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখ খুলতে অসুবিধা এবং খাবার গিলতে সমস্যা হতে পারে।

দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করিয়ে সংক্রমণ ফেলে রাখলে বিরল ক্ষেত্রে তা মুখ ও গলার গভীর অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ‘লুডউইগস অ্যাঞ্জাইনা’র মতো গুরুতর সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তখন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে আক্কেল দাঁত উঠলেই যে সেটি ফেলে দিতে হবে, এমন নয়। দাঁতটি যদি সোজাভাবে ওঠে, পরিষ্কার রাখা যায় এবং কোনো ধরনের ব্যথা, সংক্রমণ বা পাশের দাঁতের ক্ষতি না করে, তাহলে সাধারণত এটি অপসারণের প্রয়োজন হয় না।

অন্যদিকে বারবার সংক্রমণ হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথা, দাঁতটির ভুল অবস্থান কিংবা পাশের দাঁতের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসক দাঁতটি তুলে ফেলার পরামর্শ দিতে পারেন। সাধারণত স্থানীয়ভাবে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে ওই অংশ অবশ করে আক্কেল দাঁত অপসারণ করা হয়।

দাঁত তোলার পর ক্ষতস্থান পুরোপুরি ভালো হতে কয়েক দিন থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই সময়ে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়ম মেনে খাওয়া এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে আলতোভাবে কুলি করা এবং শক্ত খাবারের পরিবর্তে নরম বা তরল খাবার খাওয়া উপকারী হতে পারে।

দাঁত তোলার পর ক্ষতস্থানে তৈরি হওয়া রক্তের জমাট অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি সরে গেলে ‘ড্রাই সকেট’ নামের একটি সমস্যা হতে পারে, যাতে প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দিতে পারে এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। তাই এ সময় ধূমপান, অতিরিক্ত শক্ত খাবার কিংবা ক্ষতস্থানে অযথা চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, আক্কেল দাঁত মানুষের স্বাভাবিক দাঁতেরই একটি অংশ হলেও সবার ক্ষেত্রে এটি একই ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে না। দাঁত ওঠার সময় সামান্য অস্বস্তি হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তীব্র ব্যথা, মাড়ি ফুলে যাওয়া, পুঁজ, জ্বর, মুখ খুলতে বা খাবার গিলতে সমস্যা হলে দ্রুত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

Advertisements