১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

বন্ধুত্বের ৩০ বছর পর ডিএনএ পরীক্ষায় জানতে পারলেন তারা আপন দুই বোন

234f8a5a02edf1691567c9bf560ebf77-6aa61b867e0d6

ভারতে জন্ম নেওয়া দুই নারীকে শৈশবে আলাদা দুটি পরিবার দত্তক নিয়েছিল। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। নেদারল্যান্ডসে আলাদা পরিবারে বেড়ে ওঠা এই দুই নারী কৈশোরে এসে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হন। প্রথম দেখাতেই তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পেয়েছিলেন বন্ধুরা। কিন্তু তখন কেউই ভাবতে পারেননি, এই মিলের পেছনে রয়েছে রক্তের সম্পর্ক।

৪৩ বছর বয়সী মীনা গেলটিঙ্ক এবং ৪৪ বছর বয়সী মিনাল টাইসেন—দুজনের জন্ম ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ভারতে। জন্মের কয়েক মাস পর মুম্বাইয়ের দুটি পৃথক এতিমখানা থেকে তাদের দত্তক নেয় দুটি ডাচ পরিবার।

কৈশোরে দত্তক নেওয়া শিশুদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবার মুখোমুখি হন মীনা ও মিনাল। সেখানেই তাদের চেহারা ও আচরণের মিল দেখে উপস্থিত বন্ধুরা বিষয়টি লক্ষ্য করেন।

মীনা জানান, বন্ধুরাই তাদের দুজনকে নিজেদের মুখের দিকে ভালোভাবে তাকাতে বলেন। এরপর তিনি খেয়াল করেন, মিনালের নাক, হাসির ধরনসহ বেশ কিছু বিষয় তার নিজের সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে যাচ্ছে।

সেদিনের পর থেকেই দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তারা একে অপরের ফোন নম্বর ও ঠিকানা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। চিঠির মাধ্যমে স্কুলজীবন, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, ঘোরাঘুরি, নাচ ও গান নিয়ে গল্প করতেন। এমনকি দুজনেই যে ‘ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ’-এর গান পছন্দ করেন, সেটিও তারা জানতে পারেন।

রক্তের সম্পর্কের কোনো তথ্য না থাকলেও একে অপরের প্রতি তাদের টান ছিল অন্যরকম। তাই চিঠিতে তারা প্রায়ই একে অপরকে ‘সিস’ বা বোন বলে ডাকতেন।

Advertisements

তবে প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে, নিজের প্রথম সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মীনা।

ডিএনএ পরীক্ষাই বদলে দিল সবকিছু

২০১৭ সালে ভারত থেকে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মীনা ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন। নিজের শিকড় সম্পর্কে জানার আশায় তিনিও পরীক্ষা করান। কিন্তু তখন কোনো উল্লেখযোগ্য ম্যাচ পাননি।

চলতি বছরের শুরুতে ফোনের জায়গা খালি করতে গিয়ে তিনি ডিএনএ পরীক্ষার অ্যাপটিও মুছে ফেলেন। এরপর ২০ মে ফেসবুকে হঠাৎ মিনালের একটি বার্তা পান—‘আমাকে মনে আছে?’

মিনাল এর আগে নেদারল্যান্ডসে নিজের দত্তক বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর তিনি তার সঙ্গে মিলে যাওয়া একজন নারীর তথ্য মীনার কাছে পাঠান।

মীনা দ্রুত অ্যাপটি আবার ইনস্টল করেন। ফলাফল দেখার আগে তিনি এতটাই উত্তেজিত ও নার্ভাস ছিলেন যে বারবার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন।

অবশেষে যে তথ্য সামনে আসে, তা ছিল অবিশ্বাস্য—ডিএনএ পরীক্ষায় তাদের মধ্যে পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ এত বছর ধরে যাকে মীনা নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে চিনতেন, তিনি আসলে তার আপন বোন।

মীনার কাছে বিষয়টি ছিল জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ ফিরে পাওয়ার মতো। তিনি জানান, এতদিন যে অনুভূতি তাদের মধ্যে ছিল, ডিএনএ পরীক্ষার ফল যেন সেটিকেই সত্যি প্রমাণ করল।

‘আমরা বোন জানার আগেই বন্ধু ছিলাম’

প্রথমে ডিএনএ ম্যাচের সঙ্গে পাওয়া ব্যক্তিটি যে তার বহু বছরের পরিচিত মীনা, তা মিনাল বুঝতে পারেননি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনার ছবি দেখে বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার হয়।

মিনাল বলেন, তারা বোন হওয়ার সত্য জানার আগেই বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ এত বছর ধরে তারা অজান্তেই আপন বোনের মতো সম্পর্কের মধ্যেই ছিলেন।

আগস্টে বোন হিসেবে নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তারা আবার সামনাসামনি দেখা করেন। সেই পুনর্মিলন ছিল আবেগে ভরা। ছিল কান্না, হাসি, আলিঙ্গন এবং শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে তোলা প্রথম সেলফি।

মীনার ভাষায়, দীর্ঘদিন পর মনে হয়েছে যেন তিনি নিজের পরিবারের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ ফিরে পেয়েছেন। এত বছর দুজনের জীবনেই যে এক ধরনের শূন্যতা ছিল, বোনের সম্পর্কটি জানার পর সেটি যেন অনেকটাই পূর্ণ হয়েছে।

আলাদা পরিবারে বেড়ে ওঠা

মীনা নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে দত্তক বাবা-মায়ের কাছে বড় হয়েছেন। তার দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং মীনা একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা যান। তার মা এখনও সেই গ্রামেই থাকেন এবং মীনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।

নিজের জন্মপরিচয় জানার আগ্রহ অবশ্য ছোটবেলা থেকেই ছিল মীনার। ২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে তিনি দত্তক বাবা-মা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া ভাইকে নিয়ে মুম্বাইয়ের সেই এতিমখানায় যান। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পুরোনো নথি ঘেঁটে জন্মদাতা বাবা-মায়ের সন্ধান করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তার জন্মদাতা বাবা-মা সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি।

এবার একসঙ্গে ভারতে ফেরার স্বপ্ন

ডিএনএ পরীক্ষার পর মে মাস থেকে মীনা ও মিনাল নিয়মিত কথা বলছেন। তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী, সন্তান, মা-বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছেন।

দুজনের মধ্যে যে শারীরিক ও আচরণগত মিল রয়েছে, সেটিও এখন পরিবারের সদস্যদের চোখে পড়ছে। কথা বলার ধরন, মাথা নাড়ানো কিংবা হাঁটার ভঙ্গিতেও রয়েছে আশ্চর্য মিল।

তাদের দুজনেরই এখন একটি বড় ইচ্ছা—একসঙ্গে ভারতে ফিরে যাওয়া। যেখান থেকে তাদের জীবনের গল্প শুরু হয়েছিল, সেই মুম্বাই শহরে একসঙ্গে হাঁটতে চান তারা।

মীনা মনে করেন, জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্তে যদি তারা জানতেন যে তারা বোন, তাহলে হয়তো একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। বাবাকে হারানো কিংবা ব্যক্তিগত কষ্টের সময়গুলোতে পাশে থাকার সুযোগ না পাওয়াটা এখন তাদের কাছে আফসোসের বিষয়।

তবে হারিয়ে যাওয়া চার দশকের সেই সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার আনন্দই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড়। অজান্তে যে দুই বন্ধু সারাজীবন একে অপরকে ‘বোন’ বলে ডেকেছেন, ডিএনএ পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত তাদের সেই অনুভূতিকেই বাস্তব সত্যে পরিণত করেছে।

Advertisements