৩০ বছর পর খুলল ‘সন্ত্রাসী আদালত’, বহিষ্কার আফগান নারী

প্রায় তিন দশক নিষ্ক্রিয় থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ একটি আদালত প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে এক আফগান নারীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ‘এলিয়েন টেররিস্ট রিমুভাল কোর্ট’ নামে পরিচিত এই আদালতের মাধ্যমে ৪৭ বছর বয়সী নাজিরা হাজি জাদাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়।
নাজিরাকে ‘এলিয়েন টেররিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা হয়নি এবং কোনো অপরাধে তাকে দোষীও সাব্যস্ত করা হয়নি। অভিযোগ, ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের দিন বড় ধরনের প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনায় পরিবারের সদস্যদের সহায়তা করেছিলেন তিনি।
টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে বসবাসকারী নাজিরা যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৫ জুলাই তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ৩০ জুলাই বিশেষ আদালতে তার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের মাধ্যমে এই বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে এমন অ-মার্কিন নাগরিকদের দেশ থেকে বহিষ্কারের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য, যাদের বিরুদ্ধে থাকা তথ্য প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়।
সাধারণ অভিবাসন আইনের তুলনায় এই আদালতের প্রক্রিয়ায় কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। সরকারের কাছে থাকা গোপন বা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার আইনজীবীদের সামনে পুরোপুরি প্রকাশ না করেও আদালতে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
নাজিরার আইনজীবীরা শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, সরকারের কাছে থাকা শ্রেণিবদ্ধ প্রমাণ তারা পুরোপুরি দেখতে বা যাচাই করতে পারছেন না। ফলে সরকারের অভিযোগ যথাযথভাবে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা পক্ষের ভাষ্য, এমন প্রক্রিয়া যথাযথ আইনি অধিকার বা ‘ডিউ প্রসেস’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, নাজিরা তার ছেলে আবদুল্লাহ হাজি জাদা এবং জামাতা নাসির আহমাদ তাওহেদির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আইএস-অনুপ্রাণিত হামলার পরিকল্পনায় সহায়তা করেছিলেন। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের দিন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর আবদুল্লাহ ও তাওহেদিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের দিন হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তারা অস্ত্র ও গুলি সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় আবদুল্লাহর বয়স ছিল ১৭ বছর। পরে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং ১৫ বছরের কারাদণ্ড পান। তাওহেদিও আইএসকে সহায়তার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র ও অস্ত্র সংগ্রহসংক্রান্ত সন্ত্রাসবাদী অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
তবে নাজিরার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত এই বিশেষ আদালতের মাধ্যমেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, সরকারের হাতে থাকা প্রায় অর্ধ টেরাবাইট নথি নাজিরার আইনজীবীদের দেওয়া হয়েছিল। তবে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিবদ্ধ তথ্য পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে গত আগস্টে নাজিরা নিজেকে ‘এলিয়েন টেররিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। একই সঙ্গে তিনি আপিলের অধিকারও ছেড়ে দেন। পরে বিশেষ আদালতের প্রধান বিচারক জোয়ান এন. এরিকসেন ২০ আগস্ট তার বহিষ্কারের আদেশ অনুমোদন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পৌঁছানোর পর ১১ সেপ্টেম্বর সেই আদেশ প্রকাশ করা হয়।
নাজিরার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বহিষ্কারে সম্মতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা বিশেষ আদালতের বৈধতাকে সমর্থন করছেন। তাদের অভিযোগ, বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদের এমন একটি আদালতের সামনে হাজির করা হচ্ছে, যেখানে সরকারের ব্যবহৃত সব প্রমাণ তাদের বা তাদের আইনজীবীদের দেখানো হয় না।
আইনজীবীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই আদালতের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এর কার্যক্রম আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। নাজিরার মামলা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় গোপন প্রমাণ ব্যবহারের বৈধতা এবং আদালতের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সুযোগও আপাতত তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে, মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চে ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য, যারা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন বা প্রশ্রয় দেয়, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা উচিত নয়। তার মতে, এই মামলার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় বিচার বিভাগের হাতে থাকা আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ হয়েছে।



