ডার্ক ট্যুরিজম: সমাধিক্ষেত্র ভ্রমণে বাড়ছে তরুণদের আগ্রহ

ভ্রমণ বলতে সাধারণত চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের কথাই মনে আসে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, রোমের কলোসিয়াম কিংবা কোনো বিখ্যাত ক্যাফেতে ছবি তোলাই যেন ভ্রমণের চেনা ছবি। কিন্তু পর্যটনের সেই প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এখন অনেকে খুঁজছেন অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি ও ভিন্নধর্মী কিছু জায়গা।
তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের একটি অংশ বর্তমানে ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পুরোনো কবরস্থান ও সমাধিক্ষেত্রে। নীরব, সবুজ এসব স্থান তাদের কাছে শুধু মৃতদের শেষ ঠিকানা নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পর্যটনের এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘টুম্বস্টোন ট্যুরিজম’ বা সমাধিক্ষেত্রভিত্তিক পর্যটন। আর যারা কবরস্থান ও সমাধিসৌধ ঘুরে দেখতে আগ্রহী, তাদের বলা হয় ‘ট্যাফোফাইল’।

কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জায়গাগুলো কেন পর্যটকদের আকর্ষণ করছে?
এর অন্যতম কারণ ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ। কবরস্থানগুলোতে শুধু মানুষের সমাধি থাকে না; সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও শিল্পরুচিরও ছাপ পাওয়া যায়। অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়ে ইউরোপের জনপ্রিয় শহরগুলোর অনেক জায়গা যখন ব্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন পুরোনো কবরস্থানগুলো অনেকের কাছে হয়ে উঠছে তুলনামূলক শান্ত ও নিরিবিলি বিকল্প।
প্যারিসের বিখ্যাত পের লাশেজ (Père-Lachaise) কবরস্থান এর অন্যতম উদাহরণ। প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৩৫ লাখ দর্শনার্থী যান। বিশ্বখ্যাত এই সমাধিক্ষেত্র শুধু কবর দেখার জায়গা নয়, বরং অনেকটা উন্মুক্ত জাদুঘরের মতো। ডার্ক ট্যুরিজম গবেষক ফিলিপ স্টোনের ব্যাখ্যায়, এ ধরনের পর্যটন মূলত মৃতদের স্মৃতি ও তাদের ঘিরে থাকা ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি উপায়। অন্যদিকে জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক সু স্লোকমের মতে, মানুষের মৃত্যু ও পরকাল সম্পর্কে স্বাভাবিক কৌতূহলও এ ধরনের পর্যটনের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
পুরোনো সমাধিক্ষেত্রের আরেকটি আকর্ষণ হলো স্থাপত্য। বিশেষ করে উনিশ শতকের অনেক সমাধিফলক ও স্মৃতিসৌধে দেখা যায় ধর্মীয় প্রতীক, ভাস্কর্য, নকশা এবং বিভিন্ন সংগঠনের চিহ্ন। এসব নিদর্শন থেকে সেই সময়ের সামাজিক অবস্থান, বিশ্বাস ও শিল্পচর্চা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মানুষের শেষ ঠিকানাও পর্যটকদের আকর্ষণের বড় কারণ। পের লাশেজে সমাহিত আছেন অস্কার ওয়াইল্ড, জিম মরিসন ও এডিথ পিয়াফের মতো পরিচিত ব্যক্তিত্ব। লন্ডনের ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ কবরস্থানগুলোর অন্যতম হাইগেট সিমেট্রিতে রয়েছে কার্ল মার্ক্সের সমাধি। প্রিয় শিল্পী, সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই অনেক পর্যটক এসব জায়গায় যান।
অনেক দেশ আবার কবরস্থানকে শুধু শোকের স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসর হিসেবেও ব্যবহার করছে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরার গ্রেফ্রায়ার্স কির্কইয়ার্ডে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের হাঁটাহাঁটি, বসে বই পড়া কিংবা সময় কাটাতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ওকল্যান্ড সিমেট্রি এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড ফরেভার সিমেট্রিতেও বিভিন্ন সময় গাইডেড ট্যুর ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়।
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এই প্রবণতাকে প্রচলিত ‘টিক-বক্স ট্রাভেল’-এর বিপরীত ধারাও মনে করছেন। অর্থাৎ একটি শহরে গিয়ে দ্রুত জনপ্রিয় কয়েকটি জায়গা দেখে ফিরে আসার বদলে পর্যটকেরা এখন ধীরে ধীরে কোনো এলাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করছেন।
তবে কবরস্থান ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু নৈতিক বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। কারণ অনেক ঐতিহাসিক কবরস্থান এখনো সক্রিয়। সেখানে নিয়মিত দাফন হয় এবং শোকাহত স্বজনদের যাতায়াত থাকে। তাই পর্যটক হিসেবে সেখানে প্রবেশ করলে অন্য যেকোনো ধর্মীয় বা স্মৃতিবাহী স্থানের মতোই সংযত পোশাক ও আচরণ বজায় রাখা উচিত।
বিশেষ করে যুদ্ধ, গণহত্যা কিংবা গণকবরের মতো বেদনাদায়ক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোতে ছবি তোলার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডসের মতো জায়গায় ভ্রমণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইতিহাস জানা ও নিহতদের প্রতি সম্মান জানানো; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া নয়।

ছবি তোলার সময়ও অন্য দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। কোনো শোকাহত ব্যক্তি যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে ছবির অংশ না হয়ে যান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একইভাবে সমাধিফলকে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য বা নাম প্রকাশের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গেলেও সীমারেখা মেনে চলা জরুরি। ফুল দেওয়া বা নীরবে শ্রদ্ধা জানানোর বদলে সমাধিতে মদ ঢেলে দেওয়া, পাথরে লিপস্টিকের দাগ লাগানো কিংবা সেখানে উচ্চস্বরে গান বাজানোর মতো আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির স্মৃতির প্রতিও অসম্মান করা হয়।
কবরস্থান ভ্রমণে যা মনে রাখবেন
- যাওয়ার আগে জায়গাটির ইতিহাস ও স্থানীয় রীতিনীতি সম্পর্কে জেনে নিন।
- পুরোনো সমাধিফলক, ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধে হাত দিয়ে ক্ষতি করবেন না।
- কবরস্থানের পরিবেশের প্রতি সম্মান রেখে নীরবতা বজায় রাখুন।
- অন্য দর্শনার্থী বা শোকাহত পরিবারের ছবি অনুমতি ছাড়া তুলবেন না।
- নির্জন কবরস্থানে একা যাওয়ার আগে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করুন।
দ্রুতগতির জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততা আর প্রতিদিনের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে থাকতে অনেকের কাছেই কবরস্থান হয়ে উঠছে ভিন্ন ধরনের এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। এখানে নেই বিনোদনকেন্দ্রের কৃত্রিম চাকচিক্য; আছে ইতিহাস, স্থাপত্য, স্মৃতি আর নীরবতা।
তবে ডার্ক ট্যুরিজম যতই জনপ্রিয় হোক, এর মূল বিষয় হওয়া উচিত কৌতূহলের পাশাপাশি সম্মান। কারণ এসব জায়গায় ভ্রমণ মানে শুধু পুরোনো সমাধি দেখা নয়—একটি সময়, একটি সমাজ এবং সেখানে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের গল্পের মুখোমুখি হওয়া।



