সুন্দরবনের লোনা জলে হারিয়ে যাচ্ছে নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব

সুন্দরবন উপকূলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার দাকোপ-কয়রা কিংবা বাগেরহাটের মোংলায় অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারীর দিন শুরু হয় ভোর হওয়ার আগেই। ঘরের কাজ শেষ করে তাদের নামতে হয় লোনা পানির খাল-নদীতে। কেউ কাঁকড়া বা রেণু পোনা ধরেন, কেউ বাগদা চিংড়ির ঘেরে দিনমজুরি করেন। গর্ভাবস্থায় শরীর ভারী হয়ে এলেও কাজ থামানোর সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদে অনেকের কাছেই বিশ্রাম যেন বিলাসিতা।
‘আমাকে কি আগের মতোই কাজ করতে হবে, আমার কি কোনো নিস্তার নেই?’—এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর এমন প্রশ্নই যেন সুন্দরবন উপকূলের হাজারো নারী ও কিশোরীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদজুড়ে এর প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নারী ও কিশোরীদের ওপর।
স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের সংকটে উপকূলের নারীদের মাছ ধরার মতো কাজে অংশগ্রহণ বেড়েছে। আগে যেখানে কর্মজীবী নারীদের প্রায় ৪০ শতাংশ এ ধরনের কাজে যুক্ত ছিলেন, বর্তমানে তা প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের প্রধান নারী—কারণ জীবিকার সন্ধানে অনেক পুরুষ অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে পরিবারের আয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গর্ভাবস্থাতেও নারীদের লোনা পানিতে কাজ করতে হচ্ছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, এই লবণাক্ত পরিবেশ শুধু জীবিকাকেই নয়, নারীদের মাতৃস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। খুলনার দাকোপ উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পানীয় জলে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের পানীয় জলে সোডিয়ামের গড় মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে প্রায় ৫১৭ মিলিগ্রাম।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় নারীদের পানীয় জল থেকে দৈনিক সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ ৫ থেকে ১৬ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। বর্ষায় তা নেমে আসে শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ২ গ্রামে। অর্থাৎ বৃষ্টিপাতের তারতম্য ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে নারীদের লবণ গ্রহণের মাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও এক্লাম্পসিয়া মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ফলে উপকূলের পানিতে থাকা অতিরিক্ত লবণ নারীদের জন্য কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং জীবন-মরণের ঝুঁকিও তৈরি করছে।
দীর্ঘ সময় লোনা পানিতে কাজ করার কারণে নারীদের চর্মরোগ ও জরায়ুজনিত নানা সমস্যার কথাও জানাচ্ছে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলো। তবে এসব সমস্যার প্রকৃত কারণ ও ব্যাপকতা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জলবায়ু সংকটের সঙ্গে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বাল্যবিবাহের সঙ্গে দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাল্যবিবাহের হার ২০২০ সালে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে অন্তত ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকি ও বাল্যবিবাহের সংযোগস্থলের অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী কমিটির এক সমীক্ষায় ভোলা ও সাতক্ষীরার মতো দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু বিপর্যয়ের পর বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় দেখা যায়, দুর্যোগের পর প্রায় ৮৬ শতাংশ কিশোরীর গৃহস্থালি কাজের চাপ বেড়ে যায়। এতে লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে, আর শিক্ষার এই বিঘ্ন বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণাতেও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার শিকার উপকূলীয় জনগোষ্ঠীতে বাল্যবিবাহের হার বেশি পাওয়ার কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার ও জীবিকার অনিশ্চয়তা মিলিয়ে অনেক পরিবার মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়াকে আর্থিক চাপ কমানোর একটি উপায় হিসেবে দেখে।
এর ফলে কিশোরী বয়সেই গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশু উভয়ের জন্যই নানা জটিলতার কারণ হতে পারে। কিশোরী মায়ের ক্ষেত্রে প্রসবকালীন জটিলতা, রক্তক্ষরণ, অপুষ্টি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এর সঙ্গে উপকূলের লবণাক্ত পরিবেশ ও পুষ্টির ঘাটতি যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
কিশোরীদের পুষ্টির অবস্থাও উদ্বেগজনক। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও চরম আবহাওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যের বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছ চাষ ও মৎস্যনির্ভর জীবিকার ওপর নির্ভরশীল এসব অঞ্চলে পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তাতেও পড়ছে। ফলে কিশোরী বয়সের পুষ্টিহীনতা পরবর্তী সময়ে গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় বাধা। উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও অনেক সময় সেখানে যেতে নদী-খাল পার হতে হয়। যাতায়াত ব্যয় ও সময়ের পাশাপাশি জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি প্রসূতি সেবা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক নারী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িতেই প্রসবের ঝুঁকি নেন।
কিশোরীদের জন্য বয়সোপযোগী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগও সীমিত। বিভিন্ন ‘সেফ স্পেস’ বা নিরাপদ স্থানভিত্তিক কর্মসূচি কিশোরীদের সচেতন করার চেষ্টা করলেও এসব উদ্যোগ অনেকাংশে প্রকল্পনির্ভর এবং সীমিত এলাকার মধ্যে আটকে আছে।
শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, জলবায়ু সংকটের মানসিক চাপও উপকূলের নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়ছে। বারবার ঘূর্ণিঝড়, ঘরবাড়ি হারানো, জীবিকা নষ্ট হওয়া, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং সংসারের বাড়তি দায়িত্ব নারীদের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ ও মানসিক চাপের মধ্যে ফেলছে। কিন্তু উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
জীবিকার প্রয়োজনে নদী-খাল ও ঘের এলাকায় কাজ করা নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দুর্গম এলাকায় কাজ করার সময় যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের ঝুঁকি থাকলেও সামাজিক লজ্জা, ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অভিবাসন এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু নারীদের সচেতন করলেই হবে না। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। কিশোরীদের জন্য স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা বাড়াতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
গর্ভবতী নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে বিশ্রামের সুযোগ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ঘেরমালিক, মৎস্য আড়তদার ও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে গর্ভকালীন সময়ে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা বা সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অতিরিক্ত শারীরিক শ্রম কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। কারণ লবণাক্ততা, দুর্যোগ, বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার সংকট শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়—এসব সরাসরি নারীর শরীর, মাতৃত্ব, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।
সুন্দরবন উপকূলের সেই অন্তঃসত্ত্বা নারীর ‘আমার কি কোনো নিস্তার নেই’ প্রশ্ন তাই নিছক ব্যক্তিগত হতাশা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, লবণাক্ততা, বাল্যবিবাহ ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রাপ্যতা একসঙ্গে মিলে যে বাস্তবতা তৈরি করেছে, এটি তারই প্রতিধ্বনি। নিরাপদ পানি, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও শিক্ষার অধিকার এবং গর্ভকালীন বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে উপকূলের নারী ও কিশোরীদের জন্য সেই ‘নিস্তার’ অধরাই থেকে যাবে।



