স্বাভাবিক প্রসবে মায়েদের ভরসার নাম ‘খালেদা আপা’

গভীর রাত। প্রসববেদনায় কাতর হাবিবা আক্তারকে নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বামী ও মা ছুটে এলেন খালেদা আক্তারের বাসায়। সেদিন নিজেও কিছুটা অসুস্থ ছিলেন খালেদা। কিন্তু দরজায় এসে দাঁড়ানো এক প্রসূতি মায়ের অসহায় মুখ দেখে নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে গেলেন তিনি।
বাসার নিচতলায় থাকা কার্যালয়ের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো হাবিবাকে। শুরু হলো প্রসবের প্রস্তুতি। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টার পর সেখানেই নিরাপদে স্বাভাবিক প্রসব করালেন খালেদা আক্তার। কিছুক্ষণ পর মায়ের হাতে তুলে দিলেন ফুটফুটে এক কন্যাশিশু। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার দুলিয়াউড়া গ্রামের হাবিবা আক্তারের কাছে সেই রাতটি তাই শুধু সন্তানের জন্মের রাত নয়, বরং আজীবন মনে রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, খালেদা আপার কারণেই তাঁর সন্তান নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছে।
হাবিবা বলেন, ‘খালেদা আপা কোনো সমস্যা ছাড়াই আমার স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন। তাঁর হাতেই আমার মেয়েসন্তানের জন্ম হয়েছে। সন্তান ও আমি দুজনেই সুস্থ আছি। তাঁর কারণে আমার বাচ্চা নিরাপদে দুনিয়ার আলো দেখতে পাইছে। এ জন্য আমি আপার কাছে ঋণী।’ হাবিবার মতো এমন হাজারো মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন খালেদা আক্তার। প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে মতলব দক্ষিণ উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী হাজীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২ হাজার ২০০ মায়ের স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন তিনি। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) হিসেবে কর্মরত খালেদা। পরিবার নিয়ে থাকেন ওই কেন্দ্রের একটি ফ্ল্যাটে। ফলে কর্মস্থল ও বাসস্থান—দুটিই যেন পরিণত হয়েছে প্রসূতি মায়েদের আশ্রয়ের জায়গায়।স্থানীয়দের কাছে তাঁর পরিচয় এখন আর শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে নয়। প্রসবের সময় নির্ভরতার আরেক নাম ‘খালেদা আপা’। মতলব দক্ষিণের পাশাপাশি তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে পাশের হাজীগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার মায়েদের কাছেও।
রাত-দিন নেই, মায়ের ডাকই শেষ কথা
প্রসবের সময় কখন যে ডাক আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। কখনো গভীর রাতে, কখনো ঝড়-তুফানের মধ্যে। তবু প্রসূতি মায়ের ডাক পেলে সাড়া দেন খালেদা।
তিনি বলেন, ‘ঝড়-তুফানের সময়, গভীর রাইতেও প্রসববেদনা নিয়ে মায়েরা আমার কাছে আসেন। শরীর অসুস্থ থাকলেও তাঁদের ডাকে সাড়া দিই। খাটাখাটনি কইরা স্বাভাবিক প্রসব করাই। মায়ের কোলে ফুটফুটে বাচ্চা তুলে দিই। নিজের যত কষ্টই হোক, মায়ের মুখে হাসি দেখলে খুব স্বস্তি-শান্তি লাগে।’
এই দায়িত্ববোধই হয়তো তাঁকে এত মায়ের আস্থার জায়গায় নিয়ে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে ১৪টি স্বাভাবিক প্রসব করান তিনি। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৬৮টি প্রসব তাঁর হাতে সম্পন্ন হয়। উপজেলার প্রায় সব এলাকা ছাড়াও হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও এলাকার অনেক প্রসূতিও তাঁর কাছে আসেন।
সেবার জায়গায় নেই হিসাব-নিকাশ
খালেদার কাছে প্রসবসেবা কেবল চাকরির দায়িত্ব নয়; এটি যেন এক ধরনের মানবিক অঙ্গীকার। তাঁর কাছে আসা অনেক মায়ের কাছ থেকেই তিনি কোনো অর্থ নেন না। মতলব দক্ষিণ উপজেলার লেকোটা গ্রামের গৃহবধূ রুমানা শাহানাজের অভিজ্ঞতাও তেমনই। গত ১ আগস্ট রাতে প্রসববেদনা নিয়ে তিনি খালেদার কাছে আসেন। যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর প্রসব করান খালেদা। মা ও সন্তান—দুজনেই সুস্থ আছেন। রুমানা বলেন, ‘আপা এক টাকাও নেন নাই। সবকিছু হাসিমুখে করছে। আপার কাছে আইসা খুব ভরসা পাইছি।’
প্রশিক্ষণ থেকে মানুষের আস্থায়
খালেদার এই দক্ষতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা। ২০০৭ সালে এসএসসি পাস করার পর পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। পরে টাঙ্গাইলের পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব ও মিডওয়াইফারির ওপর ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর পেরিয়ে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য মা ও নবজাতকের পাশে থাকার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। উপজেলা পর্যায়ে সেরা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার পুরস্কার পেয়েছেন আটবার।
গত শনিবার সকালে নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন প্রসূতি সেখানে বসে আছেন। তাঁদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন খালেদা। প্রসবের আগে রক্তচাপ পরীক্ষা করে দেখছেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন এবং মায়েদের নানা দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা করছেন।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দীপ্ত দাসও খালেদার কাজের প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রসবকে গুরুত্ব দিয়ে খালেদা যেভাবে শ্রম ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। একজন স্বাস্থ্যকর্মীর দায়িত্বের সীমা পেরিয়ে খালেদা আক্তার তাই হয়ে উঠেছেন বহু পরিবারের পরিচিত মুখ। প্রসববেদনায় যখন একজন মা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন, তখন তাঁর মনে পড়ে একটি নাম—‘খালেদা আপা’। আর একটি সুস্থ সন্তানকে মায়ের কোলে তুলে দেওয়ার পর সেই মায়ের মুখের হাসিই হয়ে ওঠে খালেদার দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।



