৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

মুসলিম নারীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে বিপাকে আসাম সরকার, জরিমানার নির্দেশ হাইকোর্টের

matia-detention-center

একজন নারীকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করার পর তাঁকে আইনি প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আসাম সরকারের ওপর ক্ষতিপূরণের দায় চাপিয়েছে গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মুমতাজ বেগম নামের ওই নারীকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় তাঁকে ২ লাখ রুপি অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ম মেনে নির্বাসনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় কোনো আদালত এই প্রথম রাজ্য সরকারের ওপর এ ধরনের ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিল।

ঘটনার সূত্রপাত মুমতাজ বেগমকে নিয়ে। তাঁর পরিবার জানতে পারে, তাঁকে ভারত থেকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে গুয়াহাটি হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করা হয়। এই ধরনের আবেদনের মাধ্যমে আদালতের কাছে আটক ব্যক্তিকে হাজির করার নির্দেশ চাওয়া যায়।

মামলাটি শুনানির সময় হাইকোর্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও পক্ষভুক্ত করে। আদালত জানায়, বাংলাদেশে মুমতাজ বেগমকে খুঁজে বের করে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
একের পর এক আইনি লড়াই ,মুমতাজ বেগমের নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৭ সালে আসামে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় তাঁকে ‘ডি’ বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই সময় প্রায় তিন লাখ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। পরে সীমান্ত পুলিশের মাধ্যমে মুমতাজের মতো অনেকের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

২০১৭ সালে নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ভারতীয় নাগরিক নন বলে মত দেয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গুয়াহাটি হাইকোর্টে যান মুমতাজ। হাইকোর্ট দেখতে পায়, তাঁর দেওয়া সব নথি ও প্রমাণ ট্রাইব্যুনাল যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। ফলে মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইব্যুনালে ফেরত পাঠানো হয়। এরপরও সমস্যার অবসান হয়নি। ২০১৯ সালে আবারও তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়। এবারও মুমতাজ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত ফের দেখতে পায়, তাঁর উপস্থাপন করা প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। তাই মামলাটি আবার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। কিন্তু ৩০ মে ২০২৬-এ ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার পর ঘটে আরও গুরুতর ঘটনা।

রায় চ্যালেঞ্জের সুযোগ পাওয়ার আগেই গ্রেপ্তার

হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মুমতাজ সেদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, আগের সিদ্ধান্তের ভুলত্রুটি বিবেচনা করে মামলাটি নতুন করে দেখা হবে। কিন্তু আদালতের অভিযোগ, নতুন করে নথি পর্যালোচনার বদলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, গ্রেপ্তারের আগে ট্রাইব্যুনালের আদেশের একটি কপিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। অথচ সেই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল।

Advertisements

মামলাটি শুনতে গিয়ে গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চ ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নথি দেখলেই ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে আইনের অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আদালতের মতে, মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোয় ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপুল কুমার নাথ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলেও প্রতীয়মান হয়েছে।

‘আদেশ কখন লেখা হয়েছিল?’

মুমতাজের গ্রেপ্তারের সময় নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। পরিবারের দাবি, ৩০ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর, দুপুর ১টার দিকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং নগাঁওয়ের পুলিশ সুপার ভিন্ন সময়ের কথা জানিয়েছেন। পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত পুলিশ দুপুর প্রায় ২টার দিকে ট্রাইব্যুনাল চত্বরের কাছ থেকে তাঁকে আটক করে।

এই সময়ের পার্থক্যই হাইকোর্টের নজর কেড়েছে। আদালত আসামের হোম অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্টকে তদন্ত করে দেখতে বলেছে—৩০ মে ট্রাইব্যুনালের আদেশটি আসলে কখন লেখা হয়েছিল। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সদস্যের কম্পিউটারও জব্দ করে আদেশ লেখার সময় যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, মুমতাজকে যদি ট্রাইব্যুনাল মৌখিকভাবেও জানিয়ে দিত যে তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে দুপুর দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল চত্বর বা আশপাশে তাঁর থাকার যৌক্তিকতা ছিল না। আদালতের মতে, এসব পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে যে তাঁকে দ্রুত আটক করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর জন্যই আদেশ জারির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করা হয়ে থাকতে পারে।


আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ

হাইকোর্ট আরও বলেছে, মুমতাজকে আটক করার পর তাঁর পরিবার বা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি। ফলে তিনি ৩০ মে-র সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ার সুযোগই পাননি। আদালতের মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা একযোগে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার কারণে মুমতাজ তাঁর আইনি অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ ঘটনাকে আইনের অধীনে নির্ধারিত নির্বাসন প্রক্রিয়ার ‘সরাসরি লঙ্ঘন’ বলেও মন্তব্য করেছে আদালত। সংশ্লিষ্ট আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করার আগে তাঁর জন্য থাকা সব আইনি প্রতিকার ব্যবহারের সুযোগ শেষ হওয়া প্রয়োজন।

সংবিধানের সুরক্ষা কি সবার জন্য?

রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষা শুধু ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়, বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে আদালতের স্পষ্ট মন্তব্য।হাইকোর্ট বলেছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এমন মৌলিক অধিকার, যা আইনের ক্ষমতা ছাড়া কেড়ে নেওয়া যায় না। এই নীতি সভ্য রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃত নীতির অংশ। এই পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আদালত আসাম সরকারকে মুমতাজ বেগমকে ২ লাখ রুপি অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতেও একাধিক নির্দেশ দিয়েছে আদালত। কোনো ব্যক্তিকে ‘ঘোষিত বিদেশি’ হিসেবে আটক করার আগে জেলার পুলিশ সুপারকে নিশ্চিত করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো হয়েছে। তাঁকে এক জেলা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হলে পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকেও তা জানাতে হবে।

মুমতাজ বেগমের ঘটনা তাই কেবল একজন নারীর নাগরিকত্বের লড়াই নয়; এটি নাগরিকত্ব নির্ধারণ, আটক, নির্বাসন এবং আইনি অধিকার প্রয়োগের সুযোগ—সবকিছুকে ঘিরে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

Advertisements