বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জীবনযাপন

কাক ক্ষমাহীন! ১৭ বছর পর্যন্ত মনে ক্ষোভ পুষে রাখতে পারে

house_crow_2_0

মানুষের স্মৃতিতে কিছু ঘটনা বছরের পর বছর থেকে যায়। কেউ সহজেই পুরোনো অভিমান ভুলে যায়, আবার কেউ ছোট্ট একটি অপমানও দীর্ঘদিন মনে রাখে। কিন্তু এমন দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির অধিকারী শুধু মানুষ নয়। প্রাণিজগতেও এমন কিছু প্রাণী রয়েছে, যারা পরিচিত মুখ, বিপদ কিংবা বিরূপ অভিজ্ঞতা দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে। সেই তালিকায় রয়েছে কাক।

বুদ্ধিমান এই পাখিরা শুধু মানুষের মুখ চিনতে পারে তা-ই নয়, কোনো মানুষ তাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠলে তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, কোনো বিরূপ অভিজ্ঞতার স্মৃতি কাকের মনে ১৭ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তাই হঠাৎ কোনো কাক আপনাকে দেখে তীব্র স্বরে ডাকতে শুরু করলে বিষয়টি একেবারে হেলাফেলা করার মতো নয়। কে জানে, বহু বছর আগে আপনি অজান্তেই ওই কাকটির কিংবা তার দলের কোনো সদস্যের জন্য অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন কি না!

কাকের স্মৃতিতে মানুষের মুখ

কাকের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমনই চমকপ্রদ তথ্য সামনে আনেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী জন মার্জলাফ। গবেষণার শুরুটা হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেবার মার্জলাফ ও তার সহকর্মীরা একটি বিশেষ ধরনের মুখোশ পরে কয়েকটি কাক ধরেন। সাতটি কাককে জালের মাধ্যমে ধরে তাদের শরীরে শনাক্তকরণ ব্যান্ড লাগানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করা হলেও ঘটনাটি কাকগুলোর জন্য ছিল যথেষ্ট আতঙ্কের। শুধু ধরা পড়া কাকগুলো নয়, আশপাশে থাকা অন্য কাকেরাও পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল।
গবেষকরা এরপর জানতে চাইলেন—কাকগুলো কি সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের মুখ মনে রাখবে?

উত্তর পেতে শুরু হলো দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ। মুখোশ দেখলেই শুরু হতো ‘বকাঝকা’

পরবর্তী কয়েক বছর মার্জলাফ ও তার সহকারীরা মাঝেমধ্যে সেই একই ভয়ংকর মুখোশ পরে ক্যাম্পাস এলাকায় হাঁটতেন। উদ্দেশ্য ছিল কাকগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। অনেক কাক মুখোশটি দেখেই উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করত। যেন তারা পরিচিত বিপদকে অন্যদের সতর্ক করে দিচ্ছে। এমনকি কিছু কাক আক্রমণাত্মক আচরণও করত।

Advertisements

একবার ৫৩টি কাকের সামনে দিয়ে ওই মুখোশ পরে হাঁটার সময় ৪৭টি কাক তাকে লক্ষ্য করে ভর্ৎসনামূলক ডাক দেয়। অর্থাৎ অধিকাংশ কাকই মুখোশটির সঙ্গে আগের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তৈরি করেছিল। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সব কাক কিন্তু ঘটনাটির প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিল না। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ থেকে ধারণা করা হয়, কাকেরা সম্ভবত তাদের দলীয় সঙ্গী ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও বিপজ্জনক মানুষের চেহারা সম্পর্কে শিখতে পারে।

শুধু নিজের অভিজ্ঞতা নয়, ‘সামাজিক শিক্ষা’ও

কাকের বুদ্ধিমত্তার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের সামাজিক শিক্ষার ক্ষমতা। একটি কাক কোনো মানুষকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করলে অন্য কাকও সেই মানুষকে এড়িয়ে চলতে শেখে। অর্থাৎ একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা শুধু একটি কাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দলের অন্য সদস্যদের আচরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণেই গবেষকদের কাছে কাকের আচরণ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাদের মতে, কাক শুধু নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করে না; বরং সামাজিক পরিবেশ থেকেও বিপদের সংকেত সংগ্রহ করতে পারে। এক অর্থে, একটি কাকের ‘সতর্কবার্তা’ তার দলের অন্য সদস্যদের কাছেও পৌঁছে যেতে পারে।

১৭ বছর পরও কি ক্ষোভ ছিল?

গবেষণাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ আসে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে। গবেষকরা দেখতে পান, ভয়ংকর মুখোশ দেখলে কাকের আক্রমণাত্মক ডাক কয়েক বছর ধরে অব্যাহত ছিল। প্রায় সাত বছর পর এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। এরপর ২০১৩ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে সেই আচরণের মাত্রা কমতে শুরু করে।তবে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে সময় লেগেছে আরও কয়েক বছর। গবেষণা শুরুর প্রায় ১৭ বছর পর, একদিন হাঁটার সময় মার্জলাফ প্রথমবারের মতো এমন কোনো ভর্ৎসনামূলক ডাক শুনতে পাননি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ধারণা পাওয়া যায়, কাকের স্মৃতিতে কোনো নেতিবাচক ঘটনা অসাধারণ দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
তবে এটিকে মানুষের মতো ‘রাগ পুষে রাখা’ বলা কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক, তা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, কাক দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের মুখকে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে রাখতে পারে এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করতে পারে।

সব মুখোশই কি কাকের কাছে ভয়ংকর?

গবেষণায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে ভিন্ন ধরনের মুখোশও ব্যবহার করা হয়েছিল। এমন একটি মুখোশ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মুখের আদলে তৈরি। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কাকেরা এই মুখোশ পরা ব্যক্তিদের প্রতি একই ধরনের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
অর্থাৎ কাক শুধু মুখোশ দেখেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল না; বরং নির্দিষ্ট মুখের সঙ্গে তাদের আগের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

সিয়াটলেও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আরেকটি পরীক্ষা চালানো হয়। তারা একটি নির্দিষ্ট মুখোশ ব্যবহার করে কাক ধরেছিলেন। পরে স্বেচ্ছাসেবকদের সেই মুখোশ ও একটি নিরপেক্ষ মুখোশ পরানো হয়। স্বেচ্ছাসেবকদের জানানো হয়নি কোন মুখোশটি কাকের কাছে বিপজ্জনক হিসেবে পরিচিত।

বিপজ্জনক মুখোশটি পরেছিলেন বিল পচমার্সকি। পরে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, কাকগুলো তাকে দেখে একটানা ডাকছিল। তাদের আচরণ দেখে তার মনে হয়েছিল, তারা যেন বিশেষভাবে তার ওপরই ক্ষুব্ধ।

তাহলে কাকের ‘ক্ষোভ’ আসলে কী?

কাককে মানুষের মতো ‘অভিমানী’ বা ‘ক্ষমাহীন’ বলা হয়তো মজার এবং আকর্ষণীয়। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। কাকের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তাদের টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।

কোন মানুষ বিপজ্জনক, কোথায় খাবার পাওয়া যায়, কোথায় শিকারির উপস্থিতি রয়েছে—এ ধরনের তথ্য মনে রাখা তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী হতে পারে। তাই কোনো মানুষের সঙ্গে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলে তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখার ক্ষমতা আসলে কাকের বুদ্ধিমত্তা ও অভিযোজন ক্ষমতারই একটি দৃষ্টান্ত।

তাই পরেরবার কোনো কাক আপনাকে দেখেই অস্বাভাবিকভাবে ডাকাডাকি শুরু করলে তাকে নিছক কাকের ‘রাগ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে একবার চারপাশে তাকাতে পারেন। হয়তো সে আপনাকে চিনেছে—আর তার স্মৃতি আপনার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী!

Advertisements