বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জীবনযাপন

মধ্যবয়সের শুরুটা আসলে কখন? ৩৫, ৪০ নাকি ৫০

IMG-20260903-WA0010

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের একপর্যায়ে এসে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—আমি কি এখন মধ্যবয়সে পা দিলাম? ৩৫ বছরেই কি মধ্যবয়স শুরু হয়, নাকি ৪০ বা ৫০ থেকে? আবার কেউ কেউ ৬০ বছর বয়সেও নিজেকে মধ্যবয়সী ভাবতে পারেন। আসলে মধ্যবয়সের শুরু ও শেষের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। এটি অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের জীবনযাপন, মানসিকতা, দায়িত্ব এবং নিজের বয়স সম্পর্কে ধারণার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৯ বছর। সেই হিসাবে জীবনের ঠিক মাঝামাঝি সময় দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ বছর ৬ মাসে। কিন্তু তাই বলে ৪০-এ পা দিলেই যে একজন মানুষ মধ্যবয়সী হয়ে যাবেন, এমনটা বলার সুযোগ নেই। বিভিন্ন জরিপেও মধ্যবয়সের সীমা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। কোথাও ৪০ থেকে ৬০ বছরকে মধ্যবয়স হিসেবে ধরা হয়েছে, আবার একটি ব্রিটিশ জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের গড় মত ছিল—মধ্যবয়স শুরু হয় ৩৫ বছর বয়সে এবং শেষ হয় ৫৮ বছরে। এমনকি ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী কিছু মানুষও নিজেদের মধ্যবয়সী বলে মনে করেছেন।

তাহলে বয়সের সীমা এত অস্পষ্ট কেন?

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মার্গি ল্যাচম্যান। তাঁর গবেষণায় সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সকে মধ্যবয়স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই সীমার দুই পাশে প্রায় এক দশক পর্যন্ত তারতম্য থাকতে পারে।

অর্থাৎ, মধ্যবয়স কোনো কঠোর বয়সসীমায় আটকে নেই। বরং একজন মানুষের জীবনের কোন পর্যায়কে তিনি ‘মাঝামাঝি’ বলে মনে করছেন, সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements

মজার ব্যাপার হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবয়স সম্পর্কে মানুষের ধারণাও বদলে যায়। বিশের কোঠায় থাকা কারও কাছে ৪০ বছর মানেই মধ্যবয়স। কিন্তু ৭০ বছর বয়সী একজন মানুষ হয়তো মনে করতে পারেন, তাঁর মধ্যবয়স শুরু হয়েছিল আরও পরে—৪৮ বা ৫০-এর কাছাকাছি সময়ে।

এর পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তারুণ্যকে যেখানে সাফল্য, সৌন্দর্য ও আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং বার্ধক্যকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, সেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে দীর্ঘ সময় তরুণ হিসেবে ভাবতে চান। ফলে ‘মধ্যবয়স’ শব্দটিও হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক সীমারেখা।

মধ্যবয়স মানেই কি ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’?

মধ্যবয়সের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে ধারণাটি জড়িয়ে আছে, তা হলো ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ বা মধ্যজীবনের সংকট। বয়স বাড়ার সঙ্গে জীবনের অর্জন-অপূর্ণতা নিয়ে হতাশা, হঠাৎ বড় পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিজের জীবন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলাকে অনেক সময় এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

কিন্তু গবেষণা বলছে, মধ্যজীবনের সংকট সবার জীবনে আসবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং অনেক মানুষের কাছে এই সময়টিই হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে পরিণত ও অর্থবহ অধ্যায়। নিজের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়, জীবনের অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি সচেতনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।

বদলে যাচ্ছে জীবনের ‘মাঝপথ’

আধুনিক সমাজে মধ্যবয়সের প্রচলিত ধারণা আরও পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। অনেকেই আগের তুলনায় দেরিতে বিয়ে করছেন, সন্তান নিচ্ছেন পরে। ক্যারিয়ার গড়া, বাড়ি কেনা কিংবা আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকও অনেকের জীবনে পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে ৩০, ৪০ বা এমনকি ৫০ বছর বয়সেও অনেক মানুষ নিজেদের জীবনের ‘শুরুর দিকের’ পর্যায়ে মনে করতে পারেন।

স্বাস্থ্যসচেতনতা ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতিও এই ধারণা বদলাচ্ছে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, চিকিৎসা ও ত্বকের যত্নের কারণে অনেক মানুষের শরীরে বয়সের ছাপ আগের তুলনায় দেরিতে দৃশ্যমান হচ্ছে। ফলে চেহারা বা শারীরিক সক্ষমতা দেখেও বয়সের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়কে চিহ্নিত করা আগের মতো সহজ নয়।

দায়িত্বের জায়গা থেকেই বোঝা যায় মধ্যবয়স

ল্যাচম্যানের মতে, মধ্যবয়সকে শুধু জন্মসন দিয়ে বোঝার চেয়ে একজন মানুষের জীবনের ভূমিকা ও দায়িত্বের দিকে তাকানো বেশি কার্যকর।

জীবনের এই পর্যায়ে অনেকেই একই সঙ্গে একাধিক প্রজন্মের দায়িত্ব পালন করেন। একদিকে সন্তানদের বড় করে তোলা, অন্যদিকে বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা—দুই দিকের দায়িত্বই এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। কর্মক্ষেত্রেও তিনি হয়তো তরুণ সহকর্মীদের পথ দেখাচ্ছেন, আবার নিজের চেয়ে অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শিখছেন।

এই জায়গাতেই মধ্যবয়সের ‘মাঝখানে থাকা’র অর্থটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন মানুষ তখন একই সঙ্গে কারও কাছ থেকে শিখছেন এবং অন্য কাউকে শেখাচ্ছেন। কেউ তাঁর ওপর নির্ভর করছেন, আবার তিনিও অন্য কারও ওপর নির্ভর করছেন। তাই মধ্যবয়স একদিকে দায়িত্ব ও চাপের সময়, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা ও আত্মপরিচয়ের গভীরতারও সময়।

তাহলে মধ্যবয়স শুরু হয় কখন?

একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতেই হলে ল্যাচম্যানের গবেষণায় ৪৫ থেকে ৬৫ বছরকে মধ্যবয়সের একটি কার্যকর পরিসর হিসেবে ধরা যায়। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সংজ্ঞা নয়। কারণ মধ্যবয়স আসলে ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কোনো নির্দিষ্ট বয়স নয়। এটি এমন একটি জীবনপর্ব, যখন মানুষ নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকায়, বর্তমানের দায়িত্বগুলোকে নতুন করে বোঝে এবং ভবিষ্যতের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়।

হয়তো তাই মধ্যবয়সের সবচেয়ে যথাযথ সংজ্ঞা সংখ্যায় নয়, অনুভূতিতে। জীবনের যে সময়ে পেছনে তাকিয়ে নিজের পথচলাকে মূল্যায়ন করা যায়, আবার সামনে তাকিয়ে নতুন স্বপ্ন বেছে নেওয়ার মতো সময়ও হাতে থাকে—সেটিই হয়তো মধ্যবয়স।

Advertisements