বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিবিধ

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর দাপট, আগস্টেই আক্রান্ত ১,২০০

dengu_20260831_224428808

চট্টগ্রামে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। বছরের প্রথম কয়েক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে আগস্টে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে শুধু আগস্টেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ প্রকাশিত মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক মাসেই।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে রাউজানের নোয়াপাড়ার বাসিন্দা খালেদা বেগম (৪৭) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন।

আক্রান্তদের বিস্তৃতিও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের রোগীদের মধ্যে ৯৩৬ জন চট্টগ্রাম নগরের এবং ৯৫৫ জন জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এর বাইরে চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৯৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১ হাজার ১৫১ জন পুরুষ, ৬০২ জন নারী ও ৪৩৩ জন শিশু। এতে স্পষ্ট, ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু নগরকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও নগরের পাশাপাশি বাইরের রোগীরাও চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

Advertisements

বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছিল তুলনামূলক কম। জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। আগস্টে এসে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়ায় শনাক্তের হারও বাড়তে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগী শনাক্তের পাশাপাশি ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ারসহ বিভিন্ন পাত্রে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।’

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বর্তমান ঊর্ধ্বগতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও রোগটির ধারাবাহিক ঝুঁকি স্পষ্ট। ২০২২ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মৃত্যু হয় ৪১ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৭ জনে, মৃত্যু হয় ১০৭ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন, মৃত্যু হয় ২৭ জনের।

কোনো কোনো বছরে আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি চট্টগ্রাম থেকে কমেনি। বরং বর্ষা এলেই নতুন করে সংক্রমণের চাপ তৈরি হচ্ছে। চলতি বছরের আগস্টে আক্রান্তের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও সেই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির নতুন চিত্র সামনে এনেছে।

এদিকে চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারাদেশেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে চলতি বছরে ৩৯ হাজার ৫৩২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৪৬৭ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৯৫৪ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে সারাদেশে মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন চারজন এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৫২ জন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদার করলেই হবে না, সংক্রমণের মূল উৎস এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, ড্রেন ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ জরুরি। একই সঙ্গে নগর ও উপজেলা পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

Advertisements