না বুঝে স্টেরয়েড গ্রহণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা, শারীরিক দুর্বলতা কাটানো কিংবা ওজন ও পেশি বাড়ানোর আশায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই স্টেরয়েড গ্রহণ করেন। কেউ আবার ফার্মেসির দোকানদার, পরিচিতজন কিংবা অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করেন এসব ওষুধ। অথচ সঠিক রোগ নির্ণয়, মাত্রা ও ব্যবহারের সময়সীমা না জেনে স্টেরয়েড গ্রহণ করলে উপকারের বদলে তৈরি হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্টেরয়েড মূলত হরমোনজাতীয় ওষুধ। প্রদাহ, তীব্র অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট, অটোইমিউন রোগসহ নানা জটিল শারীরিক অবস্থার চিকিৎসায় চিকিৎসকেরা এটি ব্যবহার করেন। সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা হলে স্টেরয়েড অনেক সময় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হিসেবেও কাজ করে। এ কারণেই একে অনেকে ‘ম্যাজিক ড্রাগ’ বলে থাকেন। তবে এই শক্তিশালী ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও স্বাভাবিক হরমোনব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিজের ইচ্ছায় শুরু করা যতটা ঝুঁকিপূর্ণ
স্টেরয়েডের মাত্রা, কোন পথে এটি দেওয়া হবে এবং কত দিন ব্যবহার করতে হবে—এসব নির্ভর করে রোগের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। তাই একজনের জন্য নির্ধারিত স্টেরয়েড অন্যজনের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন বা বেশি মাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহার করলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে শরীরের নিজস্ব কর্টিসল তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই দীর্ঘদিন স্টেরয়েড নেওয়ার পর হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করাও বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে মাত্রা কমিয়ে ওষুধ বন্ধ করতে হয়।
শরীরে নানা পরিবর্তন
স্টেরয়েডের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, ওজন বৃদ্ধি এবং শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ত্বকেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ব্রণ, ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া বা অন্যান্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ভঙ্গুর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সংক্রমণের আশঙ্কাও বেড়ে যায়। চোখের ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পেশি বাড়ানোর স্টেরয়েডেও বিপদ

শারীরিক গঠন আকর্ষণীয় করা কিংবা দ্রুত পেশি বৃদ্ধির জন্য কিছু মানুষ অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। বিশেষ করে জিমে শরীরচর্চা করা ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এর প্রভাব শুধু পেশিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; শরীরের হরমোন ও প্রজননব্যবস্থাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমে যেতে পারে। শুক্রাণুর সংখ্যা কমে বন্ধ্যত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং অণ্ডকোষের আকার ছোট হওয়ার মতো পরিবর্তনও ঘটতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রেও অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের অপব্যবহার ক্ষতিকর। মাসিকের স্বাভাবিক চক্রে অনিয়ম, কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে যাওয়া এবং শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানোর মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এসবের কিছু পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র ও লিভারও ঝুঁকিতে
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং রক্তের কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ ও অন্যান্য হৃদ্যন্ত্রসংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
লিভারের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে কিছু ধরনের অ্যানাবলিক স্টেরয়েড দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে। কিছু ক্ষেত্রে কিডনির কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রভাব পড়ে মনের ওপরও
স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেবল শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন ব্যবহারে মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন, খিটখিটে স্বভাব, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা কিংবা বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করলেও শারীরিক দুর্বলতা, অস্বস্তি ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ব্যবহারে আরও বেশি সতর্ক থাকা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিশুর কোনো অসুস্থতায় দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় নিজের সিদ্ধান্তে স্টেরয়েড দেওয়া উচিত নয়।

স্টেরয়েড কার্যকর ওষুধ হলেও এটি সাধারণ কোনো ‘শক্তিবর্ধক’ বা দ্রুত সুস্থ করে তোলার ওষুধ নয়। কখন, কত মাত্রায় এবং কত দিন এটি ব্যবহার করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত রোগীর চিকিৎসাবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকই নেবেন। তাই প্রেসক্রিপশন ছাড়া স্টেরয়েড গ্রহণ কিংবা দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর নিজের ইচ্ছায় তা বন্ধ করা—দুটিই এড়িয়ে চলা জরুরি।



