সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ চূড়ায় ওঠার আশঙ্কা

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ড হয়েছে গতকাল সোমবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও চারজন। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, শুধু আগস্ট মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। এক মাসে এতসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা জুলাইয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৩ হাজার ২০৫ জন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো ঊর্ধ্বমুখী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চলতি সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানান, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, চলতি মাসেই এ বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছাতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গুর বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। বান্দরবান, বরিশাল বিভাগের সব জেলা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও খুলনায় তুলনামূলক বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন এই কীটতত্ত্ববিদ।
৬৪ জেলাতেই ছড়িয়েছে ডেঙ্গু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ পৌঁছেছে। আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপ রয়েছে বরিশাল বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৮২ জন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২৩ জন এবং দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ১৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া বরিশালে ১৩২ জন, চট্টগ্রামে ১২০ জন, খুলনায় ২৪৩ জন, ময়মনসিংহে ৬৯ জন, রাজশাহীতে ৮৭ জন, রংপুরে ৭ জন এবং সিলেটে একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় সব এলাকাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অনেক জায়গায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না গেলে আগামী দুই দশকেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আগস্টে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ
ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক চিত্রে আগস্ট মাসের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত তিন বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০২ জন। ২০২৫ সালের একই সময়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭০৫। এবার আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০২ জনে।
জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যেখানে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ৮৩৪ জন, সেখানে শুধু আগস্টেই শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২০২ জন। ফলে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঢাকার বাইরেও হাসপাতালে বাড়ছে চাপ
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৫০ শয্যার পৃথক ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন সেখানে ৭০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেকেই মশারি ব্যবহার করছেন না বলেও জানা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগী ভর্তি হওয়ার সময় প্রত্যেককে বিনামূল্যে মশারি দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক রোগী সেটি ব্যবহার না করে বালিশ বা বিছানার নিচে রেখে দেন।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত শয্যার চেয়ে বেশি রোগীকে ভর্তি রাখতে হচ্ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে থাকতে হবে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে তার শরীরেও ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু রোগী নয়, তার পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম হলেও আক্রান্তের হার যেভাবে বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। আগস্টে রেকর্ডসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি সাধারণ রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা হাসপাতালগুলোর ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সম্পৃক্ত হতে হবে।



