জবির নারী নেত্রীদের ভাবনা

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলো আরও উত্তাল হয়ে উঠেছিল নারীদের নির্ভীক উপস্থিতিতে। পুলিশের জলকামান, টিয়ারগ্যাসের শেল আর লাঠিচার্জের মুখেও ব্যানার হাতে, আহতদের সেবায়, সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলেন তারা।
অনেকের মতে দেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে নারীর এত ব্যাপক সমাবেশ কমই দেখা গেছে। কিন্তু সেই আন্দোলনের দুই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পরিস্থিতি বদলে গেল। এখন অনেকের অভিযোগ, আন্দোলনে সামনের সারিতে দাঁড়ানো নারীকে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব সারি থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে ‘না’
জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক স্বর্ণা রিয়া সেই সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সংগঠিত করেছেন। ৫ আগস্টের পরও তিনি আন্দোলনের সঙ্গেই ছিলেন। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মতামত নেওয়া হলেও তা সিদ্ধান্তে খুব একটা প্রতিফলিত হতো না।’
নিজ বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও নেতৃত্বের জায়গায় নারীকে সহজভাবে দেখে না বলে মনে করছেন লোক প্রশাসন বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী স্বর্ণা রিয়া। এদিকে কারও অনুসারী হয়ে থাকতে চাননি বলে শেষমেশ রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, ‘জি হুজুর সংস্কৃতি ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারিনি।’ তবে সম্প্রতি পুলিশ হত্যা মামলায় ৩৫ নম্বর আসামি হওয়ার পর আবার ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যে, জুলাইতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হওয়ায় এখন নিজের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
নারীকে ডাকা হয় না
নারীদের অংশগ্রহণ আর নেতৃত্বকে এক করে দেখেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাইমা আক্তার রিতা। আর রাজনীতিতে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আমাকে ডাকা হতো না। সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে শুধু জানিয়ে দেওয়া হতো।’ চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকা রিতার চোখে, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে নারীর উপস্থিতি থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রাধান্য নেই।’
রাজপথ ফেলে ব্যক্তিজীবনে ব্যস্ত
আন্দোলনে সামনে থাকা অনেক নারী পরে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বুলিংয়ের কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। এই পর্যবেক্ষণ সমকালকে জানালেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক রূপন্তী রত্না। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর নারীরা আবার পড়াশোনা, কর্মজীবন কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে গেছেন।’ নিজেও বর্তমানে পেশাগত পরিচয় গড়ে তুলতে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে জানালেন মাস্টার্সের এই শিক্ষার্থী।
প্রয়োজন কি ফুরোল?
আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শারমিন সুলতানা নিশির অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। সেই জুলাইতে হলের শিক্ষার্থীদের একত্র করায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এখন রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নানা আন্দোলনে দেখেছি, শুরুতে নারীদের লিফলেট বিতরণ, মিছিল কিংবা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কিংবা ক্যামেরার সামনে কথা বলার পর্যায়ে এলেই তাদের পেছনে সরিয়ে দেওয়া হয়।’ উপমার ব্যঞ্জনে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে ঢাল-তলোয়ার জাদুঘরে তুলে রাখা হয়। আন্দোলন শেষে নারীদের অবস্থাও এখন তেমন।’
ক্ষোভ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করা সাবেক এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘আন্দোলনের সময় নারী কী পোশাক পরছেন, কীভাবে রাজপথে দাঁড়াচ্ছেন সেসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। আন্দোলন শেষ হতেই তাঁর পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক পরিচয়– সবকিছু নিয়েই বিচার শুরু হয়। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং ও সাইবার বুলিংয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে নারীকে। পুরুষদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার বিচার দেখা যায় না।’
কেন হারিয়ে গেল নারী নেতৃত্ব?
নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতিতে বিশাল ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর। তাঁর ব্যাখ্যা হলো, ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক নারী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার অনেকে কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই রাজপথে নেমেছিলেন। লক্ষ্য অর্জনের পর তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। প্রতিবাদ করে পরে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ভাবনা সবার নেই।’
কেবল লক্ষ্য পূরণের ঢাল?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শ্যামলী শীল অবশ্য মনে করেন, ‘অনেক আন্দোলনেই নারীকে সামনে রাখা হয় এই ধারণা থেকে যে, তাদের ওপর হামলার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। নারীদের এক ধরনের ঢাল হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।’
এই নারী অধ্যাপক বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এসে নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকের জায়গা থেকে নারীকে সরিয়ে দেয়।’ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘নারীর জন্য কেউ স্বেচ্ছায় নেতৃত্বের জায়গা ছেড়ে দেবে না। নিজের অধিকার ও নেতৃত্বের অবস্থান তাদেরই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
সূত্রঃ সমকাল



