বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
এডিটরস পিক

যেথায় একাকিত্বের শেষ, সেখানেই বন্ধুত্বের শুরু: ঢাকায় ‘স্পিড ফ্রেন্ডিং’-এর নতুন ঠিকানা

যেথায় একাকিত্বের শেষ, সেখানেই বন্ধুত্বের শুরু: ঢাকায় ‘স্পিড ফ্রেন্ডিং’-এর নতুন ঠিকানা

প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও অনেকেই ভোগেন একাকিত্বে। চারপাশে সবাই যেন কোথাও না কোথাও ছুটে চলেছে—কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, কেউ পরিবারের সঙ্গে, আবার কেউ সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পে মশগুল। অথচ এই শহরের অসংখ্য মানুষ দিনের শেষে এমন একজনের খোঁজ করেন, যিনি শুধু জিজ্ঞেস করবেন, ‘কেমন আছ?’ কিংবা মন খুলে দু-চারটি কথা বলার মতো একজন সঙ্গী হবেন।

এই একাকিত্বের দেয়াল ভাঙতেই The Flow Fest আয়োজন করেছে ভিন্নধর্মী একটি উদ্যোগ—স্পিড ফ্রেন্ডিং (Speed Friending)। নামটি ঢাকার মানুষের কাছে নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই এমন আয়োজন জনপ্রিয়। বিশেষ করে ইন্ট্রোভার্ট বা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে সংকোচ বোধ করেন, এমন মানুষদের জন্য এটি একটি পরিচিত প্ল্যাটফর্ম।

অংশগ্রহণ করতে হলে আগে নিবন্ধন ফি দিয়ে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। এরপর নির্ধারিত দিনে অংশগ্রহণকারীরা জড়ো হন গুলশানের হিরোশি রামেন-এ। সেখানে সবাই একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। কিন্তু প্রত্যেকের মনে একই প্রত্যাশা—হয়তো আজ একজন নতুন বন্ধুর দেখা মিলবে।

শুরুতেই অংশগ্রহণকারীদের হাতে দেওয়া হয় একটি ছোট্ট কার্যক্রমের কাগজ, যেখানে ওয়েলনেস বা ভালো থাকার অনুভূতি নিয়ে আঁকা কিংবা নিজের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি ইচ্ছা করলে মাচা, সেসেমি আইসক্রিম কিংবা বিভিন্ন পানীয়ও অর্ডার করা যায়। পুরো পরিবেশটিই রাখা হয় স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও চাপমুক্ত।

Advertisements

এরপর শুরু হয় মূল আয়োজন। কয়েক মিনিট পরপর সবাইকে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিটি নতুন মানুষের সঙ্গে থাকে মাত্র পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ। পরিচয়, পছন্দ-অপছন্দ, কাজ, শখ কিংবা জীবনের ছোটখাটো গল্প—এই অল্প সময়েই শুরু হতে পারে একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা।

পাঁচ মিনিট হয়তো একজন মানুষকে পুরোপুরি জানার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু বন্ধুত্বের শুরু কি সব সময় দীর্ঘ আলাপেই হয়? অনেক সময় কয়েকটি আন্তরিক বাক্য, একটি হাসি কিংবা মন দিয়ে শোনা কয়েকটি মুহূর্তই নতুন সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে দেয়।

সবশেষ রাউন্ডে যাদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ তৈরি হয়, তাদের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ থাকে। ফলে প্রথম পরিচয়েই সংকোচ কাটিয়ে কথোপকথন আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়।

এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে কেউ কাউকে বিচার করতে আসে না। সবাই আসে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে। তাই পরিবেশটিও থাকে অনেক বেশি নন-জাজমেন্টাল ও আন্তরিক। বিশেষ করে যারা ইন্ট্রোভার্ট, সামাজিক পরিবেশে সহজে কথা বলতে পারেন না বা নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ শুরু করতে সংকোচ বোধ করেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা। কারণ এখানে কথা বলাটাই যেন অলিখিত নিয়ম।

এ সম্পর্কে The Flow fest এর সিইও সাজিয়া ওমর বলেন, ‘দেশে ফিরে আমি মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। প্রায় ২০ বছর ধরে যোগব্যায়ামের মাধ্যমে ওয়েলনেস নিয়ে কাজ করছি। যখন শুরু করি, তখন দেশে খুব বেশি মানুষ যোগব্যায়াম শেখাতেন না। এখন আমার স্টুডেন্টরাও অনেকেই টিচার। তবে সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, শুধু যোগব্যায়ামই সব সমস্যার সমাধান নয়। ট্রমা, বিষণ্নতা বা একাকিত্ব কাটিয়ে ওঠার অনেক পথ রয়েছে। স্পিড ফ্রেন্ডিং সেই পথগুলোর একটি। আমরা একটি জরিপে দেখেছি, প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ একাকিত্বে ভুগছেন। তাই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, যেখানে মানুষ নিরাপদ পরিবেশে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন। আমাদের দেশে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস নিয়ে নানা ধরনের ট্যাবু রয়েছে। ভালো থাকার জন্য নিজের ওপর বিনিয়োগ করা এবং এসব বিষয় নিয়ে আরও বেশি কাজ করা প্রয়োজন।’

স্পিড ফ্রেন্ডিং ছাড়াও The Flow Fest নিয়মিত বিভিন্ন ওয়েলবিয়িং ও মানসিক সুস্থতাকেন্দ্রিক আয়োজন করে থাকে। তাদের লক্ষ্য একটাই—মানুষকে একটু ভালো রাখা, একে অপরের কাছাকাছি আনা এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে একাকিত্বের মধ্যেও কেউ নিজেকে একা মনে না করেন।

বন্ধুত্ব সব সময় বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠে না। কখনও কখনও মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি আন্তরিক কথোপকথনই হতে পারে নতুন একটি সম্পর্কের শুরু। আর সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে ‘স্পিড ফ্রেন্ডিং’।

Advertisements
একাকিত্ববন্ধুত্বস্পিড ফ্রেন্ডিং