বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
নারী

কেপ ভার্দের ‘বালুদস্যু’ নারীরা: বেঁচে থাকার জন্য সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই

images (10)

পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। নীল সমুদ্র, মনোরম সৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশটি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায় দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এই সুন্দর ছবির আড়ালে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা। সান্তিয়াগো দ্বীপের চার্কো সৈকতে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন একদল নারী।

পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় নয়, বরং রুক্ষ ও পাথুরে এই উপকূলে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় এক ভয়ংকর সংগ্রাম। উত্তাল আটলান্টিকের ঢেউয়ের সামনে যাওয়ার আগে ভানিয়া তাভারেস বুকে ক্রুশ এঁকে প্রার্থনা করেন। কারণ তিনি জানেন, এই বিপজ্জনক সমুদ্রে সামান্য অসাবধানতাই ডেকে আনতে পারে মৃত্যু।

ভানিয়া একা নন। মারিয়া এলেনর মন্তেইরোসহ আরও কয়েকজন নারী প্রতিদিন ভাটার সময় চার্কো সৈকতে জড়ো হন। তাদের কাজ হলো সমুদ্রের তলদেশ থেকে কালো বালু তুলে আনা। ১০ কেজিরও বেশি ওজনের বালুভর্তি বালতি মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল পাথর, বিশাল ঢেউ এবং বিপজ্জনক সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে তাদের তীরে ফিরতে হয়।

এই নারীদের কাছে বালু তোলা কোনো সাধারণ পেশা নয়, এটি টিকে থাকার লড়াই। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা এই কঠিন কাজ করে আসছেন। স্থানীয় মানুষ তাদের পরিচয় দিয়েছেন ‘বালুদস্যু’ বা ‘স্যান্ড থিভস’ নামে।

Advertisements

দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকা জীবন

চার্কো সৈকতে প্রতিদিন যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা একই সঙ্গে কঠোর বাস্তবতা ও নীরব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মাথায় ভারী বালতির বোঝা নিয়ে মারিয়ার শরীর ক্লান্তিতে কাঁপতে থাকে। সৈকতের এক পাশে তারা দিনের পর দিন বালুর স্তূপ তৈরি করেন। কয়েক সপ্তাহের কঠোর পরিশ্রমের পর একটি ট্রাক্টর ভর্তি বালু বিক্রি করে তারা পান মাত্র ১৪০ ডলার।

বৈধ খনি থেকে উত্তোলন করা বালুর তুলনায় এই বালুর দাম কম হওয়ায় অসাধু ঠিকাদারদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। আর সেই চাহিদাই দরিদ্র নারীদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আটকে রেখেছে।

‘এটাই আমার একমাত্র পথ, অন্য কোনো কাজ আমার নেই’ —ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন মারিয়া। দীর্ঘদিনের এই পরিশ্রমে তার শরীরে জমেছে অসংখ্য ক্ষত। সমুদ্রের পাথরে আঘাত লেগে পায়ে তৈরি হয়েছে ক্ষতচিহ্ন, আর বছরের পর বছর ভারী বোঝা বহনের কারণে পিঠে স্থায়ী ব্যথা তৈরি হয়েছে।

মারিয়া জানান, অনেক সময় শারীরিক যন্ত্রণার কারণে তিনি টানা তিন দিন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।

তাদের গ্রাম থেকে চার্কো সৈকতে পৌঁছাতে প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটতে হয়। সেই গ্রামেও নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। সুপেয় পানির সংকট রয়েছে, নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান।

ভানিয়া মাত্র ১৩ বছর বয়সে দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর গত ১৬ বছর ধরে এই বালু তোলার কাজ করেই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। গ্যাস কেনার সামর্থ্য না থাকায় কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে হয় তাকে, যার ধোঁয়ায় প্রতিদিন কষ্ট পেতে হয়।

তার বোন ৩২ বছর বয়সী ভানিলদাও একই সংগ্রামের অংশ। তিন সন্তানের এই একক মা-র কাছেও বালু তোলাই পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

উন্নয়নের পেছনে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি

কেপ ভার্দের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি দেশে বালু অত্যন্ত মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। গত শতকের আশির ও নব্বইয়ের দশকে দেশটির দ্রুত নগরায়ণের পেছনে এই অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালুর বড় ভূমিকা ছিল।

পরিবেশবাদী সংস্থা ‘লানতুনা’র পরিচালক আনা ভেইগা বলেন, রাজধানী প্রেইয়ার অনেক ভবনই বাস্তবে এসব নারীর হাতে তোলা বালু দিয়ে তৈরি হয়েছে।

তবে উন্নয়নের এই পথ এখন পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে চার্কো সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। যেখানে একসময় ছিল বিস্তৃত বালুকাবেলা, সেখানে এখন দেখা যায় পাথর আর গভীর গর্ত।

সৈকতে বালু কমে যাওয়ায় নারীদের আরও গভীর পানিতে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অথচ তাদের অনেকেই সাঁতার জানেন না।

বালু উত্তোলনের ক্ষতি শুধু সৈকতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সান্তা ক্রুজ পৌরসভার কৃষি প্রকৌশলী স্যামুয়েল লিয়েল জানান, অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে সমুদ্রের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এর ফলে প্রেইয়া দে আরেইয়া গ্রান্দে সৈকতের পেছনের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে। একসময় যে জমিতে চাষাবাদ হতো, এখন সেখানে শুধু বুনো বাবলা গাছ দেখা যায়। জমি হারিয়ে প্রায় ১০০ কৃষক বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

আইন আছে, কিন্তু বিকল্প নেই

কেপ ভার্দেতে ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রণীত আইন অনুযায়ী বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অপরাধের জন্য রয়েছে জেল ও জরিমানার বিধান।

তবে বাস্তবতা হলো, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কাছে অনেক সময় আইন অসহায় হয়ে পড়ে। গত তিন বছরে এই নারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। কারণ কর্তৃপক্ষ জানে, তাদের সামনে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত।

সাম্প্রতিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে অবৈধ বালু ব্যবসা কিছুটা কমেছে। ভানিয়া জানান, এখন কখনো কখনো এক ট্রাক্টর বালু বিক্রি করতে এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠন লানতুনার সহযোগিতায় কিছু নারী এই কাজ ছেড়ে বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ শূকর পালন করছেন, কেউ ভেড়া পালন করছেন। তবে আনা ভেইগার মতে, সমাজের প্রান্তিক এই নারীদের পুনর্বাসনে সরকারের আরও বড় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অনুশোচনার ভার

বছরের পর বছর প্রকৃতির ক্ষতি করার অংশীদার হওয়ায় এখন অনুশোচনায় ভুগছেন মারিয়া মন্তেইরো। তিনি স্বীকার করেন, একসময় তারা বুঝতে পারেননি যে এই কাজের ফলে তাদের প্রিয় সৈকত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মারিয়া বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যখন বলত, বালু তুললে সৈকত নষ্ট হবে, তখন আমরা বিশ্বাস করিনি। যদি আমি সামান্য সাহায্য পাই, তাহলে আমি আর কখনো এখানে বালু তুলতে আসব না’।

মারিয়ার এই আকুতি শুধু একজন নারীর কষ্ট নয়, এটি কেপ ভার্দের হাজারো দরিদ্র মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তারা জানেন, নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য তারা প্রকৃতির ক্ষতি করছেন। কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর কর্মসংস্থানের অভাব তাদের এমন এক পথে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।

সূত্র: সমকাল

Advertisements
কেপ ভার্দেনারীবালুদস্যুসমুদ্র