বুদ্ধিমান খেলনা, নাকি বুদ্ধি গড়ে তোলা খেলনা? শিশুর জন্যে কোনটা বেশি প্রয়োজন ?

শিশুর খেলনার দোকানে গেলেই চোখে পড়ে রঙিন সব আকর্ষণীয় খেলনা। কোনোটি গান গায়, কোনোটি আলো জ্বালায়, কোনোটি পশুপাখির ডাক শোনায়, আবার কোনোটি নিজেই নড়াচড়া করে। খেলনার মোড়কে বড় করে লেখা থাকে—এক খেলনায় দশ রকম শেখার সুযোগ।
এমন খেলনা দেখলে যে কোনো মা-বাবারই ভালো লাগতে পারে। মনে হতে পারে, একটি খেলনা কিনলেই শিশু একসঙ্গে রং, সংখ্যা, বর্ণ, শব্দ—সবই শিখে যাবে।

কিন্তু সত্যিই কি শেখাটা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের খেলনার দিকে নয়, তাকাতে হবে শিশুর দিকে।
ধরা যাক, একটি শিশু খেলনার একটি বোতাম চাপল। এরপর খেলনাই গান গাইল, আলো জ্বালাল, কথা বলল, নড়াচড়া করল। শিশুর কাজ শেষ হয়ে গেল প্রায় সেখানেই। সে শুধু আরেকটি বোতাম চাপার অপেক্ষা করছে।
এবার অন্য একটি দৃশ্য কল্পনা করুন।

শিশুর হাতে দেওয়া হলো কয়েকটি গোল রিং সাজানোর একটি সাধারণ খেলনা। একটি রিং বসাতে গিয়ে সে দেখল ঠিকমতো বসছে না। একটু ঘুরিয়ে আবার চেষ্টা করল। এবার ঠিক হলো। পরেরটি ভুল জায়গায় বসাল। আবার খুলে নতুন করে সাজাতে শুরু করল।
বাইরে থেকে এই খেলনাটি হয়তো খুব সাধারণ। এতে আলো নেই, গান নেই, ঝলমলে কোনো শব্দও নেই।
কিন্তু এখানে আসল কাজটি করছে শিশুই।
সে ভাবছে, চেষ্টা করছে, ভুল করছে, আবার সেই ভুল নিজেই ঠিক করার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ছোট্ট চেষ্টা তার শেখার অংশ হয়ে উঠছে।
শিশুর শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোটদের শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের হাতে কাজ করা। তাই মন্টেসরি শিক্ষাপদ্ধতিতে এমন খেলনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে শিশুকে নিজেই ভাবতে, ধরতে, সাজাতে, মেলাতে এবং সমাধান খুঁজতে হয়।

এই পদ্ধতিতে খেলনাগুলো সাধারণত একটি কাজের ওপর মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে অনেক রকম আলো, শব্দ বা নির্দেশনা দিয়ে শিশুকে বিভ্রান্ত করা হয় না। আবার এমনভাবেও তৈরি করা হয়, যাতে ভুল হলে শিশুই অনেক সময় বুঝতে পারে কোথায় সমস্যা হয়েছে। তখন বড়দের বলে দিতে হয় না—সে নিজেই আবার চেষ্টা করে।
খেলনা বাছাইয়ের সময় তাই শুধু কতগুলো সুবিধা আছে, সেটি দেখাই যথেষ্ট নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—
এই খেলনাটি আমার শিশুকে কী করতে দিচ্ছে?

শিশুকে কি নিজের হাতে কিছু গড়তে দিচ্ছে?
সে কি কিছু মিলিয়ে দেখছে?
সে কি নতুনভাবে চেষ্টা করছে?
সে কি নিজের ভুল নিজেই বুঝতে পারছে?
নাকি খেলনাটিই সব কাজ করে দিচ্ছে?
শিশুর বিকাশ নিয়ে কাজ করা চিকিৎসকদের সংগঠনও অভিভাবকদের এমন খেলনা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেয়, যা শিশুকে শুধু দেখার বা শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তাকে ভাবতে, কল্পনা করতে, নড়াচড়া করতে এবং সমস্যা সমাধান করতে উৎসাহ দেয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত শব্দ ও আলোযুক্ত বৈদ্যুতিক খেলনার তুলনায় সাধারণ খেলনা বা বই নিয়ে খেলার সময় মা-বাবা ও শিশুর মধ্যে কথা বলা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বেশি হয়। আর এই কথোপকথনই শিশুর ভাষা শেখা, চিন্তা করা এবং সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, একাধিকভাবে ব্যবহার করা যায় এমন সব খেলনাই খারাপ। কাঠের ব্লক, বিভিন্ন আকারের টুকরা দিয়ে কিছু তৈরি করার খেলনা কিংবা কল্পনা দিয়ে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়—এমন খেলনা বরং শিশুর সৃজনশীলতা বাড়ায়। কারণ সেখানে খেলনার সম্ভাবনা তৈরি করে শিশুই।
সমস্যা তখনই হয়, যখন খেলনাটি নিজেই সব দেখায়, সব বলে দেয় এবং সব করে ফেলে। তখন খেলায় সবচেয়ে সক্রিয় থাকার কথা যার, সেই শিশুই ধীরে ধীরে শুধু দর্শক হয়ে যায়।
একটি কাঠের ধাঁধার খেলনা নিজে কথা বলে না।
একটি আকার মেলানোর খেলনা গান গায় না।
একটি রিং সাজানোর খেলনা বলে দেয় না কোনটি কোথায় বসবে।
আর ঠিক এই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শেখার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
কারণ তখন শিশুকে ভাবতে হয়।
চেষ্টা করতে হয়।
ভুল করতে হয়।
আবার সেই ভুল থেকে শিখতেও হয়।
তাই খেলনা কেনার আগে হয়তো একবার নিজেকেই প্রশ্ন করা দরকার—
খেলনাটি কি আমার শিশুর হয়ে খেলছে, নাকি আমার শিশুকেই খেলতে শেখাচ্ছে?
এই একটি প্রশ্নের উত্তরই অনেক সময় বলে দেয়, কোন খেলনাটি সত্যিকার অর্থে শিশুর শেখার সঙ্গী হতে পারে।



