বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
নারী

বন্ধুমহলের চেয়ে দু-একজনের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি? জেনে নিন ‘ওট্রোভার্ট’ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে

img_108-1

অনেকেই নিজেকে সহজেই ইন্ট্রোভার্ট বা এক্সট্রোভার্ট বলে পরিচয় দেন। কেউ নির্জনতা ভালোবাসেন বলে নিজেকে ইন্ট্রোভার্ট ভাবেন, আবার কেউ আড্ডা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বচ্ছন্দ থাকলে নিজেকে এক্সট্রোভার্ট বলে মনে করেন। কিন্তু এমনও মানুষ আছেন, যাদের আচরণ এই দুই পরিচয়ের কোনোটির সঙ্গেই পুরোপুরি মেলে না।

হয়তো একজন মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে আপনার ভালো লাগে, দু-তিনজনের ছোট পরিসরের আড্ডাতেও আপনি প্রাণবন্ত। অথচ বড় কোনো বন্ধুদের দল, অফিসের গ্রুপ কিংবা সামাজিক গোষ্ঠীর অংশ হতে গেলেই অস্বস্তি অনুভব করেন। ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হলেও দলগত পরিচয়ে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না। মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের ব্যক্তিত্বকে বলা হয় ‘ওট্রোভার্ট’ (Otrovert)।

কী এই ‘ওট্রোভার্ট’?

‘ওট্রোভার্ট’ ধারণাটি সামনে আনেন মার্কিন মনোবিদ ও সাইকিয়াট্রিস্ট ড. রামি কামিনস্কি। শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ ‘Otro’ (অন্য বা ভিন্ন) এবং ল্যাটিন ‘Vert’ (দিকে মুখ করা) থেকে। অর্থাৎ, এমন একজন ব্যক্তি যিনি প্রচলিত সামাজিক ধারা থেকে কিছুটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন।
অনেকে মনে করেন, এটি হয়তো ইন্ট্রোভার্ট ও এক্সট্রোভার্টের মাঝামাঝি একটি ব্যক্তিত্ব। তবে কামিনস্কির মতে, বিষয়টি তেমন নয়। বরং এটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের ধরন।

কেন ভুল বোঝা হয়?

বর্তমান সমাজে দলগত কাজ, টিম স্পিরিট কিংবা গ্রুপে সক্রিয় উপস্থিতিকে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। ফলে যারা বড় দলে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তাদের অনেক সময় অসামাজিক, অহংকারী কিংবা মিশুক নন—এমন ধারণা তৈরি হয়।
ওট্রোভার্ট ব্যক্তিরাও অনেক সময় নিজের আচরণ নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। তারা ভাবেন, কেন অন্যদের মতো সহজে কোনো দলের অংশ হয়ে উঠতে পারেন না। অথচ এটি ব্যক্তিত্বের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

Advertisements

ইন্ট্রোভার্ট ও ওট্রোভার্টের পার্থক্য

বাইরের আচরণে দুই ধরনের মানুষকে অনেক সময় একই রকম মনে হলেও তাদের মানসিক গঠন ভিন্ন।

মানসিক শক্তির উৎস: ইন্ট্রোভার্টরা দীর্ঘ সময় সামাজিক মেলামেশার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং একা সময় কাটিয়ে নিজেকে মানসিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন। অন্যদিকে, ওট্রোভার্টরা মানুষের সঙ্গ উপভোগ করেন। তাদের অস্বস্তির কারণ মানুষ নয়; বরং দলগত পরিচয় ও গ্রুপ সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে না পারা।

দলের সঙ্গে সংযুক্তি: একজন ইন্ট্রোভার্ট নিজের পরিবার বা ঘনিষ্ঠ ছোট একটি দলের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু ওট্রোভার্টরা প্রায়ই কোনো নির্দিষ্ট দলের সদস্য হওয়ার অনুভূতি পান না। তারা ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেন, দলকে নয়। স্বাধীন চিন্তাই তাদের শক্তিমনোবিজ্ঞানীদের মতে, ওট্রোভার্টদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা সহজে ‘গ্রুপ থিংক’ বা দলগত প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। ফলে তারা বিষয়গুলোকে তুলনামূলক নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারেন এবং প্রচলিত চিন্তার বাইরে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে সক্ষম হন। এই স্বাধীন চিন্তার কারণেই সৃজনশীলতা ও মৌলিক ধারণা তৈরিতে তারা অনেক সময় এগিয়ে থাকেন।

ইতিহাসও দেয় ইঙ্গিত

অনেক গবেষক মনে করেন, ইতিহাসের বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান সৃষ্টিশীল ব্যক্তি এমন স্বাধীন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন, ফ্রিদা কাহলো, ভার্জিনিয়া উলফ এবং দার্শনিক সোরেন কির্কেগার্ডের জীবন ও চিন্তায়ও দলগত পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গুরুত্ব ছিল স্পষ্ট।

সবার মতো না হওয়াটাও স্বাভাবিক

প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্ব এক নয়। কেউ বড় দলে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পান, কেউ আবার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যেই নিজের জগৎ খুঁজে নেন। তাই দলবদ্ধ হতে না পারলেই কাউকে অসামাজিক বা বিচ্ছিন্ন বলে বিচার করা ঠিক নয়। যদি আপনি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ভালোবাসেন, কিন্তু বড় কোনো গোষ্ঠীর অংশ হতে স্বস্তি না পান, তাহলে সেটি আপনার ব্যক্তিত্বেরই একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে। আর সেই বৈশিষ্ট্যের নামই হতে পারে—ওট্রোভার্ট।

Advertisements