ভয়ের শিকড় শৈশবে, প্রভাব কি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে?

শৈশবে অন্ধকারে একা থাকতে ভয়, বাবা-মায়ের বকুনি, স্কুলে অপমান, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর মতো অভিজ্ঞতা- এসবকে অনেকেই বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেছেন বলে মনে করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শৈশবের কিছু ভয়, আতঙ্ক বা মানসিক আঘাত পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। এগুলোর প্রভাব অনেক সময় দীর্ঘদিন মনের গভীরে থেকে যায় এবং পরবর্তী জীবনে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এমনকি অবসাদের (ডিপ্রেশন) মতো মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শৈশবের ভয় থাকলেই যে ভবিষ্যতে অবসাদ হবে, এমন নয়। বরং ভয় বা ট্রমার ধরন, তার তীব্রতা, কতদিন স্থায়ী ছিল এবং শিশুটি পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থন পেয়েছিল কি না- এসব বিষয় ভবিষ্যতের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ভূমিকা রাখে।
কীভাবে প্রভাব ফেলে শৈশবের ভয়?
শিশুর মস্তিষ্ক তখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। এই সময়ে যদি সে দীর্ঘদিন ভয়, অনিশ্চয়তা বা মানসিক চাপে থাকে, তাহলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশের স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ভয় বা আতঙ্কের মধ্যে থাকা শিশুদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা দীর্ঘ সময় বেশি থাকতে পারে। এর ফলে তারা বড় হওয়ার পর মানসিক চাপ মোকাবিলায় অন্যদের তুলনায় বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, নেতিবাচক চিন্তা এবং একসময় অবসাদের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কোন ধরনের ভয় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
সব ধরনের ভয় সমান নয়। যেমন, পরীক্ষার আগে সাময়িক ভয় বা নতুন পরিবেশে অস্বস্তি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু কিছু অভিজ্ঞতা শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। এর মধ্যে রয়েছে—
-পারিবারিক সহিংসতা -নিয়মিত ঝগড়া দেখা
-শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া
-দীর্ঘদিন অবহেলার মধ্যে বেড়ে ওঠা
-বুলিং বা অপমানের শিকার হওয়া
-দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভয়াবহ কোনো ঘটনার সাক্ষী হওয়া
-বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা প্রিয়জনের মৃত্যু
এসব পরিস্থিতি শিশুর নিরাপত্তাবোধকে নষ্ট করে দেয়। ফলে সে পৃথিবীকে একটি অনিরাপদ জায়গা হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে, যার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও থেকে যেতে পারে।
কিছু মানুষ শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। এর পেছনে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো সহানুভূতিশীল প্রাপ্তবয়স্কের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার কারও ব্যক্তিত্ব, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও তাকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে। অর্থাৎ শৈশবের ভয় একটি ঝুঁকির কারণ, কিন্তু এটি একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ নয়।
বড় হওয়ার পর কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে? শৈশবের অমীমাংসিত ভয় বা ট্রমা অনেক সময় বড় হওয়ার পর ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। যেমন:
-সব সময় অকারণ ভয় বা উদ্বেগ
-আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
-সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা
-মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে না পারা
-সব সময় নিজেকে দোষী মনে হওয়া
-আনন্দের অনুভূতি কমে যাওয়া
-দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা বা অবসাদের লক্ষণ
অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে বর্তমান সমস্যার শিকড় বহু বছর আগের কোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত।
বাবা-মায়ের কী করণীয়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ভয়কে কখনোই তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়। “এতে ভয় পাওয়ার কী আছে?”, “তুমি খুব দুর্বল”—এ ধরনের মন্তব্য শিশুর মানসিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
বরং শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। যদি কোনো ভয় দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, শিশুর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে বা আচরণে বড় পরিবর্তন আনে, তাহলে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যাদের শৈশব সুখকর ছিল না, তাদের জন্যও সুসংবাদ হলো—মস্তিষ্ক পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ উপযুক্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, সামাজিক সমর্থন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অতীতের মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলা, প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া এবং আত্মযত্নের অভ্যাস গড়ে তোলা মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
শৈশবের ভয় বা আতঙ্ককে “ছোটদের বিষয়” বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ জীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতাগুলোই একজন মানুষের মানসিক ভিত্তি তৈরি করে। সেই ভিত্তিতে যদি দীর্ঘদিন ভয়, অনিরাপত্তা বা মানসিক আঘাত জমা হয়, তবে ভবিষ্যতে অবসাদসহ নানা মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এটাও সত্য, শৈশবের ভয় মানেই ভবিষ্যতে অবসাদ নয়। ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ, সময়মতো মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা একজন মানুষকে অতীতের ভয় কাটিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তাই শিশুর ভয়কে অবহেলা না করে বোঝার চেষ্টা করাই হতে পারে ভবিষ্যতের মানসিক সুস্থতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।



