ক্যারিয়ার, মাতৃত্ব, নতুন স্বপ্ন—চল্লিশেই নারীর জীবনের সোনালি সময়

লন্ডনে ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমার প্রিমিয়ারে নীল রঙের ডিয়র গাউন পরে নজর কাড়েন ৪৩ বছর বয়সী হলিউড অভিনেত্রী অ্যান হ্যাথাওয়ে। আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে পোজ দেওয়ার সময় স্নেহভরে নিজের অন্তঃসত্ত্বা পেট জড়িয়ে ধরেন তিনি। সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে মা হতে যাওয়ার সুখবরও ভাগ করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। এর আগে গত এপ্রিলে ৪৫ বছর বয়সী অভিনেত্রী নাটালি পোর্টম্যানও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানিয়েছিলেন।

মাত্র এক দশক আগেও চল্লিশোর্ধ্ব কোনো অভিনেত্রীর মা হওয়ার খবর প্রকাশ পেলে উর্বরতা চিকিৎসা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হতো, আর চিকিৎসকরাও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জানাতেন। কিন্তু এবার হ্যাথাওয়ে ও পোর্টম্যানের ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন।
১৯৯০-এর দশকেও ৪২ বছর বয়সে মা হওয়া ছিল বিস্ময়ের বিষয়। ১৯৮৯ সালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র When Harry Met Sally-তেও চল্লিশে পা দেওয়াকে ঘিরে ছিল এক ধরনের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। সে সময় প্রচলিত ধারণা ছিল, ৪০ বছর মানেই জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো প্রায় শেষ, নতুন করে শুরু করার সুযোগ খুব কম। তবে তিন দশক পর সেই ধারণা আমূল বদলে গেছে।
বর্তমানে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা বাস্তবতায় মানুষ ঘর কেনা, ক্যারিয়ার গড়া কিংবা সন্তান নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আগের তুলনায় অনেক পরে নিচ্ছেন। ফলে বিশেষ করে নারীদের কাছে চল্লিশের দশক এখন আর জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; বরং নতুন সম্ভাবনা, পরিবর্তন এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এই পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছে পরিসংখ্যানও। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনেছেন এমন মানুষের গড় বয়স দাঁড়িয়েছে ৪০ বছর।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্য বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের সন্তান জন্মদানের হার ১৯৩ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ২০ শতাংশের বয়স চল্লিশের কোঠায়, যাদের মধ্যে ৬৬ শতাংশই নারী। একই সঙ্গে সিডিসির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশটিতে নারীদের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১.৪ বছর। ফলে আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান সময়ের চল্লিশোর্ধ্ব নারীরা দীর্ঘ, সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।
এই বয়সে এসে অনেকেই ম্যারাথনে অংশ নিচ্ছেন, নতুন ব্যবসা শুরু করছেন, নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছেন কিংবা সম্পূর্ণ নতুন ক্যারিয়ার বেছে নিচ্ছেন। ফলে হলিউড থেকে শুরু করে ক্রীড়াঙ্গন—সবখানেই চল্লিশোর্ধ্ব নারীরা এখন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন।

১৯৯১ সালে ৪৫ বছর বয়সী ডায়ান কিটন Father of the Bride চলচ্চিত্রে কনের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অথচ এখন ৪৩ বছর বয়সী লুপিতা নিয়ং’ও The Odyssey চলচ্চিত্রে ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি চরিত্র ‘হেলেন অব ট্রয়’-এর ভূমিকায় অভিনয় করছেন।

অন্যদিকে, ৪৫ বছর বয়সেও কিম কার্দাশিয়ানের ব্যক্তিগত জীবন ও প্রেম নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমেনি। আবার গত মাসে ৪৪ বছর বয়সী সেরেনা উইলিয়ামসকে উইম্বলডনের একক প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখা গেছে। তার বড় বোন, ৪৬ বছর বয়সী ভেনাস উইলিয়ামসও এখনও পেশাদার টেনিস সার্কিটে সক্রিয়। তারা হারিয়ে যাননি, বরং সমাজও আর তাদের হারিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করে না।
তবে সম্ভাবনায় ভরা এই নতুন বাস্তবতার একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো করার চাপ অনেকের কাছেই মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ‘কখনোই দেরি হয়ে যায় না’—এই বহুল প্রচলিত কথাটি যেমন অনেককে অনুপ্রাণিত করে, তেমনি কারও কারও কাছে তা অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপও তৈরি করে।
অনেকে অ্যান হ্যাথাওয়ে বা নাটালি পোর্টম্যানের জন্য আনন্দিত হলেও নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে সন্তানের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, চল্লিশ বছর বয়সকে শুধু নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলে জীবনের আগের চার দশকের অভিজ্ঞতা ও অর্জনের মূল্য কিছুটা আড়াল হয়ে যায়।
বাস্তবতা হলো, চল্লিশের দশককে আর বার্ধক্যের শুরু হিসেবে দেখা হয় না। এটি তরুণ বয়সও নয়, আবার বৃদ্ধ বয়সও নয়। বরং এটি এমন এক সময়, যখন অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও পরিণত চিন্তার সমন্বয়ে মানুষ জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ়ভাবে নিতে পারে।
উইম্বলডনে একটি ম্যাচে হারের পর সেরেনা উইলিয়ামস বলেছিলেন, জয়-পরাজয়ের চেয়ে সেই মুহূর্তটিকে উপভোগ করাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শুধু সাফল্য নয়, ব্যর্থতাকেও সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখে।
তাই বর্তমান বাস্তবতায় চল্লিশের দশককে শুধু ‘মিডল এজ’ বা মধ্য বয়স বলে সংজ্ঞায়িত না করে, বরং জীবনের সবচেয়ে পরিণত, সম্ভাবনাময় এবং অর্থবহ সময়—‘প্রাইম টাইম’—বলা আরও বেশি যৌক্তিক।



