বাঁশ খাবেন যেভাবে এবং এর উপকারিতা

বাঁশ শুধু পান্ডার প্রিয় খাবার নয়, মানুষের জন্যও এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যতালিকায় নিয়মিত বাঁশের কচি অঙ্কুর রাখলে মিলতে পারে নানা ধরনের স্বাস্থ্য উপকারিতা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হজমশক্তি উন্নত করা এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়াসহ বহু অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় দীর্ঘদিন ধরেই বাঁশের কচি অঙ্কুর ব্যবহার হয়ে আসছে। এর পুষ্টিগুণের কারণে একে বর্তমানে ‘সুপারফুড’ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিবেদনে বাঁশের কচি অঙ্কুরের বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত হয় এবং রক্তের ক্ষতিকর চর্বি বা লিপিডের মাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাঁশের কচি অঙ্কুরে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী কার্যক্রম বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে কোষের ক্ষতি কমে এবং শরীর বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।
গবেষণার সহলেখক এবং যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক লি স্মিথ বলেন, বাঁশের কচি অঙ্কুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে আলু, রুটি ও অন্যান্য শর্করাযুক্ত খাবার উচ্চ তাপে রান্না করলে অ্যাক্রিলামাইড ও গ্লাইসিডামাইড নামে ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। এসব যৌগের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে বাঁশের কচি অঙ্কুরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভূমিকা রাখতে পারে।
তার ভাষ্য, এসব যৌগের অতিরিক্ত সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ
বাঁশের কচি অঙ্কুরে ক্যালরি ও চর্বি কম থাকলেও এতে রয়েছে প্রচুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। প্রতি এক কাপ বাঁশের কচি অঙ্কুরে প্রায় ৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এছাড়া এতে রয়েছে খাদ্যআঁশ, প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, ফসফরাস, আয়রন এবং ভিটামিন এ, বি–৬, ই, কে, থায়ামিন ও নিয়াসিন।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক জোয়ান সালজে ব্লেক বলেন, এটি এমন একটি খাবার, যার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। এতে থাকা উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া বাঁশের কচি অঙ্কুরের হালকা বাদামি স্বাদ ও মচমচে টেক্সচার বিভিন্ন খাবারের স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়।

কাঁচা নয়, অবশ্যই রান্না করে খেতে হবে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বাঁশের কচি অঙ্কুর কখনোই কাঁচা খাওয়া উচিত নয়।
অধ্যাপক লি স্মিথের মতে, কাঁচা বাঁশের কচি অঙ্কুরে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড নামে একটি যৌগ থাকে। এটি শরীরে গিয়ে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করতে পারে, যা সায়ানাইড বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন অল্প মাত্রায় এই যৌগের সংস্পর্শেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যাকে গয়টার বলা হয়।
যেভাবে প্রস্তুত করবেন
তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুর রান্নার আগে ভালোভাবে ধুয়ে বাইরের শক্ত ও আঁশযুক্ত অংশ ছেঁটে ফেলতে হবে।
এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী টুকরো করে ফুটন্ত পানিতে সামান্য লবণ দিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট সেদ্ধ করতে হবে অথবা নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে।
পুষ্টিবিদ ভারতী রমেশ জানান, সেদ্ধ করার ফলে ক্ষতিকর সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এরপর এটি নিরাপদে খাওয়ার উপযোগী হয়।
রান্না করা বাঁশের কচি অঙ্কুর ভাজি, স্যুপ, স্ট্যু, কারি, সালাদ, অমলেট, ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবারে ব্যবহার করা যায়।

ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুরও ভালো বিকল্প
অনেক এলাকায় তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুর সহজে পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই রান্না করা ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুর একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ও শেফ অ্যাবি গেলম্যান বলেন, তাজা ও ক্যানজাত—উভয় ধরনের বাঁশের কচি অঙ্কুর প্রায় একইভাবে রান্নায় ব্যবহার করা যায়। যদিও ক্যানজাত করার সময় কিছু অণুপুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে, তবুও এতে খাদ্যআঁশসহ প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদান বজায় থাকে।
তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুরের তুলনায় কিছু পুষ্টিগুণ কমে গেলেও ক্যানজাত বাঁশের কচি অঙ্কুর সহজলভ্য, ব্যবহার উপযোগী এবং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সহজেই যুক্ত করা যায়।



