শুধু মন নয়, শোকে ভেঙে পড়ে শরীরও!

আমরা সাধারণত শোক, হতাশা বা প্রিয়জন হারানোর কষ্টকে শুধুই মানসিক যন্ত্রণা হিসেবে দেখি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, গভীর মানসিক আঘাতের প্রভাব শুধু মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো শরীরকে নাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় মানসিক কষ্টের চেয়েও শারীরিক উপসর্গগুলো বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র শোকের সময় শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এমনকি পরিপাকতন্ত্রও প্রভাবিত হয়। তাই মন খারাপের সময় শরীর দুর্বল লাগা বা অসুস্থ বোধ করা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
পেশি ও জোড়ায় ব্যথা
গভীর মানসিক চাপের সময় শরীর অজান্তেই পেশিগুলোকে শক্ত করে রাখে। দীর্ঘ সময় এই টান বজায় থাকলে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ এবং বিভিন্ন জোড়ায় ব্যথা শুরু হতে পারে।
মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে। ফলে অনেকের তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেন দেখা দেয়। এর সঙ্গে আলো-শব্দে অস্বস্তি কিংবা বমি বমি ভাবও থাকতে পারে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়
শোকের সময় শরীরে প্রদাহের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত স্ট্রেস হরমোন শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে সর্দি-কাশি, জ্বর বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
হৃদ্যন্ত্রেও পড়ে প্রভাব
অত্যন্ত তীব্র মানসিক আঘাতের ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ দেখা দিলেও এর কারণ হতে পারে অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
হজমে সমস্যা ও ঘুমের ব্যাঘাত
মানসিক চাপের সময় শরীরের স্বাভাবিক বিপাকপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কারও ক্ষুধা একেবারে কমে যায়, আবার কেউ অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, অনিদ্রা বা অতিরিক্ত ঘুমের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কত দিন থাকে এই প্রভাব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শারীরিক উপসর্গ কমতে শুরু করে এবং এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে শোক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ‘কমপ্লিকেটেড গ্রিফ’-এ রূপ নিতে পারে। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শুধু মানসিক নয়, শারীরিক যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে শোকের সময় কী করবেন?
-পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
-পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
-হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন।
-একা না থেকে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলুন।
-প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিন।
-মেডিটেশন, প্রার্থনা কিংবা ডায়েরি লেখার অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, শোক জীবনেরই একটি অংশ। তবে সেই শোক যখন শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করতে শুরু করে, তখন সেটিকে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় যত্ন ও সহায়তা নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।



