বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
নারী

অসুস্থতা আর অর্থকষ্টে জর্জরিত কাঙালিনী সুফিয়া, কে নেবে দায়িত্ব?

images (28)

একসময় তার গান শুনতে মানুষের ঢল নামত। লোকগানের সুরে তিনি মুগ্ধ করেছেন দেশের কোটি শ্রোতাকে, প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। অথচ আজ বয়স, অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের ভারে নুয়ে পড়েছেন কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া। যে কণ্ঠ একসময় মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিল, আজ সেই কণ্ঠ প্রায় নীরব।

কয়েক সপ্তাহ আগে বাথরুমে পড়ে গিয়ে তার একটি হাত ভেঙে যায়। এর আগেই বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এখন আর নিয়মিত গান গাওয়া বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান আয়ের পথও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে সংসারে ছয়জনের দায়িত্ব, নিজের চিকিৎসা এবং প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকার ওষুধের ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই হয়ে উঠছে আরও কঠিন। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও নিয়মিত চালিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারকে।

অথচ এই শিল্পীর জীবন শুরু হয়েছিল পথে পথেই। ঢাকার ফুটপাত, মাজার কিংবা জনসমাগমের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।

Advertisements

১৯৮১ সালের এক সন্ধ্যায় ঢাকার হাইকোর্ট মাজার এলাকায় গান গাওয়ার সময় তার কণ্ঠে মুগ্ধ হন বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক ও কবি ফজল-এ-খোদা। অচেনা এক পথশিল্পীর অসাধারণ কণ্ঠ শুনে তিনি বুঝেছিলেন, এই প্রতিভার জায়গা কেবল পথ নয়।

তার উদ্যোগেই বাংলাদেশ বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান সুফিয়া। পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার তার নামের আগে যুক্ত করেন ‘কাঙালিনী’ উপাধি। সেই থেকেই পথশিল্পী সুফিয়া খাতুন পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘কাঙালিনী সুফিয়া’ নামে।

জীবনের সেই মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্তটির কথা এখনও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘আমি তখন পথে পথে গান গাইতাম। পথেই আমার জীবন কেটেছে। কবি ফজল-এ-খোদা আমাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তার কারণেই আজ মানুষ আমাকে চেনে’।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ‘পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’, ‘মনে বাবলা পাতার কষ লেগেছে’, ‘আমার মাটির গাছে লাউ ধইরাছে’, ‘বন্ধু চেনা দায়’ এবং ‘ওকি ময়নারে’র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান তাকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পীর আসনে পৌঁছে দেয়।

১৯৬১ সালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মনাম ছিল টুনি হালদার। কৈশোরেই গানকে জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন। পরে ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাম রাখেন সুফিয়া খাতুন।

শিল্পীজীবনে পাঁচ শতাধিক গান রচনা করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের লোকসংগীতকে তুলে ধরেছেন নিজের কণ্ঠে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অর্জন করেছেন অন্তত ৩০টি জাতীয় এবং ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

তবে সাফল্যে ভরা সেই জীবনের শেষ অধ্যায় যেন এক নির্মম বাস্তবতার গল্প।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার কল্যাণপুর বিলপাড়া গ্রামে সরকারিভাবে নির্মিত হয়েছে তার বসতঘর এবং ‘সুফিয়া একাডেমি’। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে জানা যায়, চিকিৎসার কারণে তিনি তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তবে প্রতিবেশীদের কথায় উঠে আসে তার বর্তমান সংগ্রামের চিত্র।

প্রতিবেশী বিবি হাওয়া বলেন, “তিনি আমাকে খালা বলে ডাকেন। সংসারে টানাপোড়েনের কারণে অনেক সময় আমার বাড়িতে এসে খাবার খান। এত বড় একজন শিল্পীর এমন কষ্ট দেখতে খুব খারাপ লাগে।”

স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মুরাদ ব্যাপারীর ভাষায়, ‘তার কারণেই আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে, পাকা রাস্তা হয়েছে, দেশের নানা জায়গা থেকে মানুষ আসে। অথচ যার জন্য এত পরিবর্তন, সেই মানুষটিই আজ ভালো নেই’।

প্রতিবেশী আলমগীর পাটোয়ারী জানান, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন মাঝেমধ্যে আর্থিক সহায়তা করলেও চিকিৎসা ও ওষুধের বিপুল ব্যয়ের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়।

আরেক প্রতিবেশী মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘কাঙালিনী সুফিয়া নামটি যেন আজ তার বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে গেছে। এত সম্মান, এত পুরস্কারের পরও শেষ বয়সে এমন কষ্ট সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না’।

মুঠোফোনে শিল্পীর মেয়ে পুষ্প জানান, তার মায়ের ওষুধের পেছনেই প্রতি মাসে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো অনুষ্ঠান করতে না পারায় সেই অর্থ জোগাড় করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা মাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপ নিতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু সংসারের বাস্তবতা তো চাপ কমায় না’।

পুষ্প আরও জানান, আগে সরকার থেকে শিল্পী সম্মানী হিসেবে বছরে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পেতেন তার মা। বর্তমানে সেই ভাতা কমে বছরে মাত্র ১২ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। এছাড়া একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা পান। এই সামান্য অর্থ দিয়ে সংসারের খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রাজবাড়ী উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আহমদ বলেন, “কাঙালিনী সুফিয়া আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পথ থেকে উঠে এসে তিনি বাংলাদেশের লোকসংগীতকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছেন। তার জীবনের এই পরিণতি আমাদের সবার জন্যই বেদনাদায়ক।”

কাঙালিনী সুফিয়ার জীবন যেন এক অসমাপ্ত বৃত্তের গল্প। যে মানুষটি পথে পথে গান গেয়ে জীবনের শুরু করেছিলেন, সেই তিনিই একসময় হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকশিল্পী। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়ে যায়—যে শিল্পী একদিন পথের গান দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, বেঁচে থাকার জন্য কি আবারও তাকে সেই পথেই ফিরতে হবে?

Advertisements
অর্থকষ্টঅসুস্থকাঙালিনীসুফিয়া